বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণ উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। উৎসবে মেতে ওঠার পাশাপাশি বক্তারা দেশের আবহমান ঐতিহ্য রক্ষা এবং পশ্চিমা ও বিজাতীয় সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব থেকে সমাজকে মুক্ত রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ‘দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ’-এর ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে এই বিশেষ শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। নারী, শিশুসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে শোভাযাত্রাটি রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রমনা পার্কে গিয়ে শেষ হয়। গ্রাম-বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী নানা অনুষঙ্গ যেমন—মাছ ধরার পলো, ঢেঁকি, খেওয়া জাল ও কুলার প্রদর্শনী শোভাযাত্রাটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দান করে। শিশুদের ঐতিহ্যবাহী সাজপোশাক এবং দেশাত্মবোধক গান, জারি, সারি ও ভাটিয়ালির সুরে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
শোভাযাত্রার প্রারম্ভে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জামায়াত সাংসদ সাইফুল আলম খান মিলন এবং নুরুল ইসলাম বুলবুল। তারা বলেন, দেশীয় সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে এগিয়ে নিতে হবে এবং নিজস্ব ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরতে হবে। বিজাতীয় সংস্কৃতির নগ্ন আগ্রাসন বন্ধে কার্যকর সরকারি পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে তারা আরও বলেন, বাঙালির প্রকৃত চেতনা জাগ্রত করার এখনই সময়। তবে মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে ইমান-আকিদা (ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূলনীতি) ক্ষুণ্ণ হয় কিংবা ইসলামি শরিয়াহর (ধর্মীয় বিধান) পরিপন্থী এমন কোনো অপসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে তারা সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
একই দিনে রাজধানীর বাংলামোটর এলাকা থেকে বর্ণাঢ্য রেলি বের করে জাতীয় নাগরিক পার্টি। তাদের আয়োজনে ‘নাগরিক বর্ষবরণ ১৪৩৩’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে, প্রতি বছরের মতো এবারও ভোরের আলো ফোটার আগে ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সুরের ধারা ও চ্যানেল আই। ‘জাগাও পথিককে, ও সে ঘুমে অচেতন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ধানমণ্ডি এলাকায় পৃথক মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে বর্ষবরণ পর্ষদ।
নববর্ষের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বৈশাখী শোভাযাত্রাটি সকাল ৯টায় শুরু হয়। শাহবাগ ও টিএসসি এলাকা প্রদক্ষিণ করা এই শোভাযাত্রার এবারের মূলমন্ত্র ছিল ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। বিভিন্ন মোটিফ (শিল্পকলার নকশা বা প্রতীক) ও বর্ণিল ভাস্কর্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধ আগামীর স্বপ্ন বুনেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। পুরো রাজধানী জুড়েই এদিন ছিল উৎসবের আমেজ, যেখানে ঝালমুড়ি আর বৈশাখী মেলার ধুম পড়েছিল প্রতিটি কোণায়।
বাংলা নববর্ষ কেবল একটি দিন নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও পহেলা বৈশাখ উদযাপন যে দেশের আপামর জনসাধারণের প্রাণের উৎসব, তা রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের আয়োজনেই স্পষ্ট। তবে বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন রুখে দেওয়ার যে দাবি উঠেছে, তা সমাজ ও সংস্কৃতির স্বকীয়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিকতার সাথে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটানোই হোক আমাদের আগামী দিনগুলোর প্রকৃত লক্ষ্য।