লক্ষ্মীপুরে এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় নিজের সন্তানসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করার পর ভবন থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন নাছির আহমদ নামে এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য। সোমবার সকালে লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাঞ্চানগর এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাঞ্চানগর এলাকার পেশকার বাড়িতে ঘটে যাওয়া এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা এখনো আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে আছেন। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে যখন পুরো শহর দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই সাবেক পুলিশ কনস্টেবল নাছির আহমদের ভাড়া বাসায় শুরু হয় আর্তচিৎকার। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, নাছির আহমদ হঠাৎ করেই ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা তার নিজের ছেলে ইমরানকে (২১) ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে শুরু করেন। সন্তানের জীবন বাঁচাতে করা চিৎকারে আশপাশের মানুষ যখন ছুটে আসেন, তখন নাছির আহমদ আরও হিংস্র হয়ে ওঠেন।
বাসা থেকে রক্তাক্ত অস্ত্র হাতে বেরিয়ে এসে তিনি সামনে যাকে পেয়েছেন তার ওপরই হামলা চালিয়েছেন। এই হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন ওই বাড়ির বাসিন্দা গোলাম রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান এবং আবদুল মান্নানের ছেলে নাছির আহমদ। রক্তাক্ত এই তণ্ডব চালানোর পর তিনি দ্রুত ওই তিনতলা ভবনের ছাদে উঠে যান এবং সেখান থেকে নিচে ঝাঁপ দেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সবাইকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাছির আহমদের মৃত্যু হয়।
নিহত নাছির আহমদ চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার এখলাসপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানায় ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং প্রায় এক বছর আগে চাকরি থেকে অবসরে (পিআরএল) যান। অবসরে যাওয়ার পর থেকে তিনি সপরিবারে ওই ভাড়া বাসায় বসবাস করে আসছিলেন। স্থানীয়রা জানান, অবসরকালীন জীবনের শুরু থেকেই তিনি অনেকটা চুপচাপ এবং অসংলগ্ন আচরণ করতেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. আরমান জানিয়েছেন, হাসপাতালে আনা চারজনের মধ্যে সাবেক পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। তবে আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী জানান, প্রাথমিক তদন্তে নাছির আহমদ মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ বিষয়টি নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার সংকীর্ণতাকে আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে অবসর নেওয়া সদস্যদের দীর্ঘদিনের কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ এবং পরবর্তী জীবনে একাকীত্ব বা বিষণ্নতা তাদের কতটা ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে, তা ভাববার বিষয়। শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক সমস্যাকেও গুরুত্ব দেওয়া এবং সময়মতো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, যাতে এমন জীবনঘাতী পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়।