সীমান্তের কাঁটাতারে ফের ঝরল রক্তের দাগ। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন খাদেমুল নামের এক যুবক। মধ্যরাতের সেই বিভীষিকা এখন উত্তর আমঝোল গ্রামে শোকের মাতম নামিয়ে এনেছে।
সীমান্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে বুধবার রাত দুইটার দিকে গর্জে ওঠে বিএসএফের আগ্নেয়াস্ত্র। ঘটনাটি ঘটেছে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তের বনচৌকি বিওপি (সীমান্ত ফাঁড়ি) এলাকায়। বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত যুবকের নাম মো. খাদেমুল (২৫)। তিনি উপজেলার উত্তর আমঝোল গ্রামের আমজাদ হোসেনের সন্তান। জীবিকার তাগিদে কিংবা সীমান্ত পারাপারের কোনো এক অজ্ঞাত উদ্দেশ্যে তিনি সেই রাতে সীমান্তে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি সূত্রে জানা যায়, বুধবার গভীর রাতে খাদেমুলসহ কয়েকজন বাংলাদেশি যুবক সীমান্ত খুঁটি (সীমান্ত পিলার) ৯০৫/৬ এস-এর কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন। এলাকাটি ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ১৫০ গজ ভেতরে ছিল। সে সময় ভারতের ৭৮ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের পাগলামারী ক্যাম্পের একটি টহল দল তাদের উপস্থিতি টের পায়। কোনো প্রকার সতর্কতা বা আলাপ ছাড়াই বিএসএফ সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি (এক ধরনের বিশেষ ছোট গুলি যা মূলত পাখি শিকার বা বিক্ষোভ দমনে ব্যবহৃত হলেও প্রাণঘাতী হতে পারে) ছোড়ে।
বিএসএফের ছোড়া সেই বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় খাদেমুলের মুখমণ্ডল, বুক ও মাথা। গুরুতর জখম অবস্থায় সঙ্গীরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত বাংলাদেশের ভেতরে নিয়ে আসে। রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় এবং অবস্থার অবনতি দেখে তাকে রাতেই রংপুরের একটি বেসরকারি চিকিৎসালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ।
খাদেমুলের অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারে চলছে হাহাকার। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবা আমজাদ হোসেন এখন নির্বাক। এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, বিএসএফ বারবার সীমান্ত এলাকায় প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সামান্য সন্দেহের বশে একজন মানুষকে এভাবে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বিজিবি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। সীমান্তে এই ধরনের রক্তক্ষয়ী ঘটনা কেন ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে বিএসএফের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়া চলছে। পতাকা বৈঠক বা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান।
সীমান্তে বাংলাদেশিদের মৃত্যু নতুন কিছু নয়, তবে প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের সীমান্ত সুরক্ষা এবং প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষীদের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। খাদেমুলের নিথর দেহ এখন শোকের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকে নিয়মিত টহল জোরদার করা হলেও সাধারণ মানুষের অসচেতনতা এবং বিএসএফের মারমুখী অবস্থান প্রায়ই এমন করুণ পরিণতির সৃষ্টি করছে।
সীমান্তে হত্যার হার শূন্যে নামিয়ে আনার দীর্ঘদিনের যে প্রতিশ্রুতি ভারত ও বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেওয়া হয়, এই ঘটনাটি সেই প্রতিশ্রুতিকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল। বিশেষ করে ‘নন-লেথাল ওয়েপন’ বা অ-প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কথা থাকলেও ছররা গুলিতে বুক ও মাথা ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ে বিএসএফের আচরণে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। সীমান্ত হত্যার এই চিরচেনা চিত্র বন্ধ করতে হলে কেবল কূটনৈতিক আলাপ নয়, বরং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও মানবিক ও কঠোর তদারকি প্রয়োজন। সাধারণ নাগরিকদেরও সীমান্ত পারাপারের ভয়াবহ ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।