২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে চালানো অভিযানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এই গণহত্যায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে বলে জানা গেছে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর (প্রধান আইনজীবী) আমিনুল ইসলাম তার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, শাপলা চত্বরে চালানো সেই রাতের অভিযানে যে নৃশংসতা ঘটেছিল, তা নিয়ে বর্তমানে নিবিড় তদন্ত চলছে। তদন্তে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসায় তাকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হবে। পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য যে, এর আগে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্য একটি মামলায় এই সাবেক পুলিশ প্রধানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেই রায় চ্যালেঞ্জ করে তিনি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন। তবে শাপলা চত্বরের ঘটনাটি তার জন্য নতুন আইনি জটিলতা তৈরি করতে যাচ্ছে।
ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ৫ মে ব্লগারদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং ইসলাম ধর্ম অবমাননা ও নারীনীতির বিরোধিতাসহ ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিল হেফাজতে ইসলাম। সারাদেশ থেকে লাখ লাখ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এই মহাসমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সমাবেশকে কেন্দ্র করে মতিঝিল এলাকায় নজিরবিহীন সহিংসতা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে গভীর রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সমাবেশকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সেই রাতের অভিযানে ৬১ জন নিহত হওয়ার দাবি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ তখন দাবি করেছিল যে, নিহতের সংখ্যা ৯৩ জন। সংগঠনটি নিহতদের বিস্তারিত তালিকাও প্রকাশ করেছিল। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সেই রাতের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে পুনরায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এক যুগ আগের একটি রক্তাক্ত অধ্যায় নিয়ে পুনরায় তদন্ত শুরু হওয়া দেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। শাপলা চত্বরের সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জনমনে আজও নানা প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা রয়েছে। তৎকালীন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়, তবেই তা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারবে। স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়াই কেবল ইতিহাসের এমন কালো দাগ মুছে দিতে সহায়ক হতে পারে।