আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারডুবির খবরে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত এখন শোকে স্তব্ধ। স্বামী বা সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে অনিশ্চয়তা আর বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে উপকূলীয় জনপদের বাতাস।
আয়েশা বেগম তিন সন্তানের জননী, চতুর্থ সন্তানটি পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায়। অথচ এই খুশির খবরের বদলে তাঁর চোখে এখন কেবলই নোনা জলের প্লাবন। স্বামী বেলাল মিয়া জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন, কিন্তু গত ১২ দিন ধরে তিনি নিখোঁজ। সাগরে ট্রলারডুবির খবর আসার পর থেকে আয়েশা জানেন না তাঁর সন্তানদের বাবা আদৌ বেঁচে আছেন, নাকি গভীর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছেন।
আয়েশার মতো একই ভাগ্য বরণ করেছে টেকনাফের শতাধিক পরিবার। গত শনিবার কোস্টগার্ড (উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি গভীর সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করেছে ‘মেঘনা প্রাইড’ নামের একটি বাংলাদেশি জাহাজ। পরে তাদের টেকনাফ থানায় সোপর্দ করা হলে স্বজনহারা মানুষদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরাই জানিয়েছেন সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের ইনানী ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে আড়াই শতাধিক যাত্রী নিয়ে একটি বড় ট্রলার মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যাত্রার অষ্টম দিনে বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ে ট্রলারটি সাগরে তলিয়ে যায়।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নেঙ্গুলবির গ্রামের ঘরে বসে বিলাপ করতে করতে আয়েশা জানান, তাঁর স্বামী পেশায় কৃষক ছিলেন। পান চাষ করে সংসার চলত টেনেটুনে। কিন্তু দালালদের প্রলোভনে পড়ে উন্নত জীবনের আশায় তিনি এই মরণযাত্রায় সামিল হন। নিখোঁজ আনোয়ার সাদেকের বাবা মোহাম্মদ ইলিয়াছও থানা প্রাঙ্গণে হাহাকার করছিলেন। তিনি জানান, শাকের মাঝি নামের এক দালালের খপ্পরে পড়ে তাঁর ছেলে সাগরপথে রওনা দিয়েছিল। এখন ছেলের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা কেউ বলতে পারছে না।
এই ট্রলারডুবির ঘটনায় উঠে এসেছে স্থানীয় পাচারকারী ও দালালদের একটি দীর্ঘ তালিকা। শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিনসহ আরও অনেকের নাম মুখে মুখে ফিরলেও তারা এখন এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে। অভাবের সুযোগ নিয়ে দালালেরা সাধারণ মানুষকে এই বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিখোঁজদের সন্ধানে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি দালালের তালিকা ধরে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। তবে উদ্ধার হওয়া ৯ জন বাদে বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
উন্নত জীবনের মরীচিকা আর দালালদের মরণফাঁদ বারবার আমাদের উপকূলীয় সহজ-সরল মানুষকে সাগরের বুকে বিলীন করে দিচ্ছে। পেটের দায়ে বা ভাগ্য বদলের নেশায় এই আত্মঘাতী যাত্রা কি কখনো শেষ হবে না? একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শোক, অন্যদিকে আইনি জটিলতা—উপকূলের এই নিঃস্ব পরিবারগুলোর দায়ভার কে নেবে? দালালদের মূল উৎপাটন করতে না পারলে হয়তো আয়েশাদের মতো আরও হাজারো নারীর আহাজারিতে প্রতিবছরই বর্ষবরণের আকাশ এভাবে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে উঠবে।