স্ত্রী আফরা ইভনাথ খান ইকরাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করার মতো গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ছোটপর্দার অভিনেতা জাহের আলভীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল উদ্দিনের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেছিলেন এই অভিনেতা। তবে দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত তার আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে সোজা কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে বিনোদন অঙ্গনে শোক ও বিতর্কের জন্ম দেওয়া এই বিয়োগান্তক ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় নিল।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের বয়ান থেকে এক করুণ ও অমানবিক চিত্র উঠে এসেছে। জানা যায়, ২০১৩ সালে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন জাহের আলভী ও আফরা ইভনাথ ইকরা। তাদের সংসারে একটি ফুটফুটে পাঁচ বছর বয়সী পুত্রসন্তান রয়েছে। তবে ভালোবাসার এই বিয়ে একসময় রূপ নেয় চরম বিষাদে। ইকরার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই শাশুড়ি নাসরিন সুলতানা শিউলির প্ররোচনায় স্ত্রীর ওপর ধারাবাহিক মানসিক নির্যাতন চালাতেন আলভী।
পরিস্থিতি চূড়ান্ত অবনতির দিকে যায় প্রায় দুই বছর আগে। ইকরা জানতে পারেন, তার জীবনসঙ্গী আলভী অন্য এক নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন। এই বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাদের দাম্পত্য জীবনে তীব্র টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। দুই পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার পারিবারিকভাবে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তাতে কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি। উল্টো ইকরাকে সংসার থেকে বিতাড়িত করার জন্য মানসিক চাপ, গঞ্জনা ও অপমান প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মানসিক আঘাতের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে, অন্তর্জাল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ইকরাকে চরমভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হতো। আত্মহত্যার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জাহের আলভী সেই অন্য নারীর সঙ্গে নিজের ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। পরিবারের দাবি, স্বামীর এমন অমানবিক, নিষ্ঠুর ও উসকানিমূলক আচরণ ইকরাকে মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে তোলে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, মানসিক চাপ ও চরম হতাশা থেকে মুক্তির পথ না পেয়ে তিনি নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস (ডিফেন্স অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি) এলাকার একটি বাসা থেকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় ইকরাকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর ২ মার্চ ইকরার বাবা কবির হায়াত খান বাদী হয়ে পল্লবী থানায় জাহের আলভী ও তার মা নাসরিন সুলতানা শিউলিকে আসামি করে আত্মহত্যায় প্ররোচনার একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেন।
উল্লেখ্য, এই একই মামলায় গত ৪ জুন অভিনেতা আলভীর মা নাসরিন সুলতানা শিউলি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন লাভ করেছিলেন। তবে মামলার প্রধান অভিযুক্ত জাহের আলভীর ক্ষেত্রে আদালত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সর্বশেষ শুনানিতে আলভী বা তার আইনজীবীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য গণমাধ্যমে আসেনি। বর্তমানে বিচারাধীন এই মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে আছেন ইকরার শোকসন্তপ্ত পরিবার, যারা স্বজন হারানোর তীব্র বেদনায় ন্যায়বিচারের আশায় প্রহর গুনছেন।