Logo
ট্রেন্ডিং: ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনে প্রধান উপদেষ্টা ভাঙ্গায় অবরোধের তৃতীয় দিনে থমথমে অবস্থা, যান চলাচল স্বাভাবিক  এক মাস বাড়লো ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ ফ্যাসিস্টদের আমরা আইনের আওতায় আনবো: রেজাউল করিম মল্লিক

সিরাজগঞ্জে যান্ত্রিক ত্রুটিতে সড়কে ঝরল তিন প্রাণ: চোখের পলকেই এতিম হলো শিশুকন্যা

Roksana
29 August 2026, 02:06 AM পড়তে ১ মিনিট
সিরাজগঞ্জে যান্ত্রিক ত্রুটিতে সড়কে ঝরল তিন প্রাণ: চোখের পলকেই এতিম হলো শিশুকন্যা

সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে চলন্ত অবস্থায় একটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের চাকার অক্ষদণ্ড ভেঙে গেলে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। নিয়ন্ত্রণ হারানো যানটিকে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী বড় যান বা বাস চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই স্বামী-স্ত্রী ও চালকের মৃত্যু হয় এবং তাদের শিশুকন্যা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। শুক্রবার সকালের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা পুরো এলাকায় গভীর শোক ও আতঙ্কের ছায়া নামিয়ে এনেছে।


শুক্রবার সকালের স্নিগ্ধ আবহাওয়া মুহূর্তেই রূপ নিল এক ভয়ংকর মৃত্যুপুরীতে। সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার সিরাজগঞ্জ-এনায়েতপুর আঞ্চলিক সড়কে মেঘুল্লা এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। সপ্তাহের ছুটির দিন সকালে পরিবার নিয়ে হয়তো কোনো আনন্দময় গন্তব্যে বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন এক দম্পতি। তাদের সাথে ছিল আদরের কন্যাসন্তান। কিন্তু তাদের সেই সাধারণ যাত্রা যে অনন্তকালের যাত্রায় পরিণত হবে, তা হয়তো কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। এই একটি দুর্ঘটনা যেন চোখের পলকে একটি সাজানো সংসারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালে বেলকুচির মেঘুল্লা এলাকায় মহাসড়ক দিয়ে একটি যাত্রীবাহী ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান নিজস্ব গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। যানের যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে হয়তো কোনো পারিবারিক আলাপে মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ চলন্ত অবস্থাতেই যানটির চাকার সঙ্গে সংযুক্ত মূল লোহার দণ্ডটি (যাকে যান্ত্রিক ভাষায় চাকার অক্ষদণ্ড বলা হয়) বিকট শব্দে ভেঙে যায়। চাকার সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় চালক তাৎক্ষণিকভাবে তার যানের ওপর থেকে সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। নিয়ন্ত্রণহীন যানটি ভারসাম্য রাখতে না পেরে ছিটকে সরাসরি রাস্তার ঠিক মাঝখানে চলে যায়।

ঠিক সেই চরম বিপদের মুহূর্তেই বিপরীত দিক থেকে প্রবল বেগে ছুটে আসছিল একটি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বড় যান (বাস)। চালক শেষ মুহূর্তে চেষ্টা করেও এত অল্প সময়ের মধ্যে ভারী গাড়িটির গতি রোধ করতে পারেননি। চোখের পলকেই সেই দানবীয় গাড়িটি ছোট ওই তিন চাকার যানটিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে চাপা দেয়। পিষ্ট করার পর বড় গাড়িটিও নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পেরে রাস্তার পাশের একটি বিশাল গাছে সজোরে ধাক্কা খেয়ে থেমে যায়। বিকট শব্দ শুনে আশেপাশের বাড়িঘর ও দোকানপাট থেকে স্থানীয় মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে ছুটে আসেন।

এই ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক দুর্ঘটনায় ছোট যানটি একেবারে দুমড়েমুচড়ে যায়। পিষ্ট হওয়া যানের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা রক্তে ভিজে যায় পিচঢালা পথ। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিন চাকার যানটিতে থাকা যাত্রী স্বামী মোতালেব সরকার (৪০) এবং তার স্ত্রী ফজিলা খাতুন (৩৫)। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ওই যানের চালক নুরু মিয়া (৩৫)। নিহত মোতালেব ও ফজিলা দম্পতির আদি বাড়ি বেলকুচি উপজেলার আজুগড়া হিজলতলা এলাকায়। অন্যদিকে নিহত চালক নুরু মিয়ার বাড়ি একই এলাকার জামতৈল আজুগড়া গ্রামে।

দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। খবর পেয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় স্থানীয় পুলিশ এবং দমকল বাহিনীর (অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী দল) একটি চৌকস দল। এলাকাবাসী ও উদ্ধারকর্মীদের যৌথ প্রচেষ্টায় দুর্ঘটনাকবলিত যানের লোহালক্কড় কেটে নিহতদের মৃতদেহ এবং গুরুতর আহত অবস্থায় ওই দম্পতির আদরের সন্তান তামান্না খাতুনকে উদ্ধার করা হয়। বাবা-মাকে হারানো এই ভাগ্যহীনা শিশুটিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত এনায়েতপুরের খাজা ইউনুস আলী নামের একটি বড় বেসরকারি চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটি বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

বেলকুচি থানার প্রধান কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ইমাম জাফর গণমাধ্যমকে এই দুর্ঘটনার মর্মান্তিক সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ছোট যানটির চাকার মূল দণ্ড ভেঙে যাওয়াই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর ঘাতক বড় গাড়িটির চালক ও তার সহযোগী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত দুটি গাড়িকেই উদ্ধার করে বর্তমানে স্থানীয় থানা পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের মৃতদেহ তাদের স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বজনদের কান্নায় হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আইনি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং পলাতক চালককে আটকের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে এক চিরস্থায়ী বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিরাজগঞ্জের এই ঘটনাটি কেবল একটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং আমাদের পরিবহন ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়ভাবে তৈরি ব্যাটারিচালিত এসব যানে ব্যবহৃত নিম্নমানের যন্ত্রাংশ যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে, আজকের এই চাকার দণ্ড ভেঙে যাওয়ার ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অন্যদিকে, আঞ্চলিক সড়কগুলোতে বড় যানগুলোর বেপরোয়া গতি এই বিপদকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিদিন এভাবেই সড়কে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ, আর পেছনে রেখে যাচ্ছে তামান্নার মতো চিরতরে এতিম হওয়া শিশুদের কান্নার আওয়াজ। গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে অননুমোদিত যানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সেগুলোর যান্ত্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভারী যানগুলোর চালকদের বেপরোয়া মনোভাব দমনে প্রশাসনকে এখনই কঠোর এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে সড়কের এই মৃত্যুর মিছিল কখনোই থামানো সম্ভব হবে না।

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
বাংলাদেশ

সিরাজগঞ্জে যান্ত্রিক ত্রুটিতে সড়কে ঝরল তিন প্রাণ: চোখের পলকেই এতিম হলো শিশুকন্যা

R
Roksana | 05 June 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার