নতুন দিনের নতুন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে বাংলার আকাশ। পুরনো সব জীর্ণতা মুছে ফেলে নতুনের আহ্বানে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে সমবেত হয়েছে হাজারো প্রাণ। ঐতিহ্যবাহী গান আর হাজার কণ্ঠে বৈশাখী আবাহনের মধ্য দিয়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে রাজধানী, যেখানে সুরের জাদুতে বরণ করে নেওয়া হয়েছে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে।
পহেলা বৈশাখের স্নিগ্ধ ভোরে বাঙালির চিরায়ত উৎসবের আমেজে সেজেছে ধানমন্ডি লেক সংলগ্ন রবীন্দ্র সরোবর এলাকা। চ্যানেল আই ও সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'সুরের ধারা'র যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও আয়োজিত হয়েছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকেই যন্ত্রসংগীতের ঝংকার আর সমবেত কণ্ঠে 'এসো হে বৈশাখ' গানের মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো শুরু হয়। উৎসবের এই জোয়ারে ভেসেছে আবালবৃদ্ধবনিতা।
অনুষ্ঠানে সুরের ধারার কয়েকশ শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সারা দেশ থেকে আগত শিল্পীরা একাত্ম হয়েছেন। হাজার কণ্ঠে যখন সমবেত সংগীত পরিবেশিত হচ্ছিল, তখন পুরো এলাকায় এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি হয়। দেশের প্রথিতযশা শিল্পী রফিকুল আলম, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, কিরণ চন্দ্র রায় থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী কোনাল ও লুইপারা তাদের পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। বিশিষ্ট আবৃত্তিকার জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের দরাজ কণ্ঠের কবিতায় যেন প্রাণ ফিরে পায় বসন্তের বিদায় আর বৈশাখের আগমনী বার্তা। অনুষ্ঠানটি সাবলীলভাবে উপস্থাপনা করেন দীপ্তি চৌধুরী।
রবীন্দ্র সরোবরের এই আয়োজনটি কেবল গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনুষ্ঠানস্থলের পাশেই বসেছে জমজমাট বৈশাখী মেলা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজসপত্র, বাঁশ ও বেতের কারুকাজ, রঙিন কাচের চুড়ি আর লোকজ খাদ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন কারিগররা। মেলায় আসা শিশুদের প্রধান আকর্ষণ ছিল নাগরদোলা। যান্ত্রিক শহরের বুকে এক টুকরো গ্রামীণ মেলা যেন সবাইকে শেকড়ের টানে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
উৎসবে উপস্থিত থেকে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ এবং পরিচালক জহিরউদ্দিন মাহমুদ মামুনসহ শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা। অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে নববর্ষের শুভেচ্ছা ও সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তার বক্তব্যে উঠে আসে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথা।
পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় সংহতির এক অনন্য প্রতীক। হাজার কণ্ঠে এই বর্ষবরণ কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক শেকড়কে আঁকড়ে ধরার এক বলিষ্ঠ চেষ্টা। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যখন বিশ্বায়নের জোয়ারে ভাসছি, তখন রবীন্দ্র সরোবরের এই মেলা আর গান আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের নিজস্ব পরিচয়। এই সুর আর সংহতি যেন সারা বছর আমাদের যাপিত জীবনে অটুট থাকে, এটাই হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার।