দেশের সংগীত জগতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসর 'চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কার' (মিউজিক অ্যাওয়ার্ড) এবার ঢাকার বাইরে উত্তরাঞ্চালের পুণ্যভূমি বগুড়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ৭ এপ্রিলের এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বাংলা গানের দুই কিংবদন্তি শিল্পী কনক চাঁপা ও কাঙালিনী সুফিয়াকে তাঁদের দীর্ঘদিনের অনবদ্য অবদানের জন্য বিশেষভাবে সম্মানিত করা হবে।
বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণভোমরা সংগীতকে উদযাপন করতে প্রতি বছরের মতো এবারও বসছে 'চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কার ২০২৫'-এর আসর। তবে এবারের আয়োজনে যোগ হয়েছে ভিন্ন মাত্রা, কারণ এই উৎসবের মঞ্চ বসছে উত্তরের জেলা বগুড়ায়। আগামী ৭ এপ্রিল শহরের অভিজাত আবাসিক হোটেল ও বিনোদন কেন্দ্র 'মমো ইন'-এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে সুরের এই মিলনমেলা। এই খবরের সত্যতা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন অনুষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম।
এবারের আসরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো 'আজীবন সম্মাননা'। বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক (পর্দার আড়ালে গান গাওয়া) জগতের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী কনক চাঁপাকে তাঁর কয়েক দশকের সুরেলা পথচলার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হচ্ছে। কয়েক হাজার কালজয়ী গানের এই শিল্পী তাঁর মায়াবী কণ্ঠ দিয়ে জয় করেছেন কোটি শ্রোতার হৃদয়। অন্যদিকে, বাংলার মাটির গান বা লোকসংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তি কাঙালিনী সুফিয়াকে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ সম্মাননা। পল্লীগীতি ও লোকজ সুরকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার পেছনে তাঁর যে ত্যাগ ও সাধনা, তাকেই সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করবে এই মঞ্চ।
পুরস্কারের এই বিশাল আয়োজনে কেবল সম্মাননাই নয়, সুস্থ ও মানসম্পন্ন সংগীতকে উৎসাহিত করতে আরও ১৮টি ভিন্ন ভিন্ন বিভাগে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। আধুনিক গান, ধ্রুপদী সংগীত, লোকসংগীত এবং চলচ্চিত্রের গানসহ বিভিন্ন শাখায় গত বছরের সেরা সৃষ্টিগুলোকে বিশেষজ্ঞ বিচারক মণ্ডলীর রায়ে পুরস্কৃত করা হবে।
এই তারকাখচিত সন্ধ্যায় উপস্থিত থাকবেন দেশের সংস্কৃতি ও শিল্প অঙ্গনের দিকপালরা। আয়োজনের মূল কাণ্ডারি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর এবং পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম।
অনুষ্ঠানটিকে বর্ণিল করতে মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন বাংলা গানের দুই নক্ষত্র রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমিন। তাঁদের সাথে আরও যোগ দেবেন প্রথিতযশা অভিনেতা আফজাল হোসেন, বরেণ্য শিল্পী মো. খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম এবং বর্তমান প্রজন্মের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কোনাল, ঝিলিক, ইমরান, লিজা ও লুইপা। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের এই মিলনমেলা বগুড়ার আকাশ-বাতাসকে সুরের জাদুতে ভরিয়ে তুলবে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করছেন।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, মমো ইনের বিশাল প্রাঙ্গণে মঞ্চ তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে এমন বড় মাপের আয়োজন তৃণমূল পর্যায়ের সংগীতানুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বগুড়ার স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের শহরে দেশের সেরা সব শিল্পীদের আগমনে বেশ উচ্ছ্বসিত। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বগুড়ার মতো একটি ঐতিহাসিক স্থানে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংগীত পুরস্কারের আয়োজন নিশ্চিতভাবেই স্থানীয় সংস্কৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে। বিশেষ করে কনক চাঁপার মতো শিল্পীকে আজীবন সম্মাননা এবং কাঙালিনী সুফিয়াকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া আমাদের গুণীজনদের মূল্যায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই ধরনের স্বীকৃতি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের দেশীয় ও সুস্থ ধারার সংগীত চর্চায় আরও বেশি অনুপ্রাণিত করবে। শিল্পীর মর্যাদা রক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে এমন আয়োজন প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।