টালিউড বা পশ্চিমবঙ্গের বাংলা চলচ্চিত্র জগতে শোকের কালো মেঘ যেন কিছুতেই কাটছে না। জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার মাত্র ২৮ বছর বয়সেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন উদীয়মান পার্শ্ব অভিনেতা (যাদের সাধারণত জুনিয়র আর্টিস্ট বলা হয়) প্রণব চট্টোপাধ্যায়। অভাব আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা কীভাবে একজন সম্ভাবনাময় শিল্পীর প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, প্রণবের চলে যাওয়া যেন সেই রূঢ় বাস্তবকেই আবার সামনে নিয়ে এলো।
চলচ্চিত্র জগতের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, প্রণব চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরেই চরম কাজের সংকটে ভুগছিলেন। সবশেষ তাকে জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘শ্রীমান ভগবান দাস’-এ অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল। সেই কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে আর কোনো নতুন বা নিয়মিত কাজের প্রস্তাব আসছিল না তার কাছে। এই দীর্ঘ কর্মহীনতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা তাকে মানসিকভাবে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় সেই বিশাল মানসিক চাপ আর সহ্য করতে পারছিলেন না এই তরুণ।
অভিনেত্রী অলোকানন্দা গুহ এই মর্মান্তিক পরিণতির বিষয়ে শোক প্রকাশ করে জানান যে, প্রণব কাজের জন্য প্রায়ই পরিচিত সবার সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি বলেন, “খবর নিয়ে যতটুকু জানতে পেরেছি, নিয়মিত কাজ না থাকায় তিনি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় থাকতেন। সেই গভীর উদ্বেগ থেকেই হঠাৎ তার তীব্র আতঙ্কজনিত স্নায়বিক চাপ (প্যানিক অ্যাটাক) তৈরি হয়। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও দুর্ভাগ্যবশত পথেই তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।” অলোকানন্দা আরও জানান, ব্যক্তিগতভাবে তিনি যখনই কোনো বিজ্ঞাপন বা প্রচারমূলক কাজের সুযোগ পেতেন, প্রণবকে ডাকার চেষ্টা করতেন এবং নিজের সাধ্যমতো তাকে পারিশ্রমিক দিতেন।
প্রণবের এই অকাল প্রয়াণে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার আজ সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। মাত্র ২৮ বছর বয়সী এই অভিনেতার কাঁধেই ছিল বৃদ্ধ বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, প্রণব খুব বেশিদিন আগে সংসার জীবনে প্রবেশ করেননি। তার স্ত্রীর বয়স মাত্র ২১ থেকে ২২ বছর। জীবনের শুরুতেই এমন বিশাল শূন্যতা আর শোকের পাথর বুকে নিয়ে কীভাবে এই পরিবারটি ঘুরে দাঁড়াবে, তা ভেবেই সহকর্মীদের চোখে জল আসছে।
টালিউডের অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যায়, পর্দার ঝলমলে আলোর নিচে এমন হাজারো ‘প্রণব’ প্রতিদিন স্টুডিও পাড়ায় ঘুরে বেড়ান সামান্য একটি কাজের আশায়। বড় পর্দার জৌলুসের আড়ালে তাদের জীবন কাটে চরম অর্থকষ্টে। সহকর্মীরা বলছেন, প্রণব ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান একজন মানুষ। অভাবের তাড়নায় তিনি কারো কাছে কাজের জন্য সাহায্য চাইতেও দ্বিধা করতেন না। সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর মুখ আর পরিবারের সদস্যদের দুবেলা দুমুঠো অন্নের সংস্থান করাই ছিল তার জীবনের প্রধান সংগ্রাম। সেই সংগ্রামেই অবশেষে ক্লান্ত হয়ে বিদায় নিলেন তিনি।
কিছুদিন আগেই রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকস্মিক মৃত্যু পুরো বিনোদন জগতকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই শোকের ছায়া কাটতে না কাটতেই প্রণবের এই মৃত্যু ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের গভীর অনিশ্চয়তা ও শিল্পীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটকে নতুন করে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে যারা ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে একটি দৃশ্যকে প্রাণবন্ত করেন, সেই সব পার্শ্ব শিল্পীদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
প্রণব চট্টোপাধ্যায়ের এই বিদায় কেবল একটি সাধারণ মৃত্যু নয়, বরং আমাদের বিনোদন মাধ্যমের অন্ধকার দিকটির এক করুণ প্রতিচ্ছবি। পর্দার পেছনের এই লড়াই সাধারণ মানুষের অগোচরেই থেকে যায়। প্রতিটি এমন মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেবল তারকাদের নয়, বরং পর্দার পেছনের কারিগর ও ছোট চরিত্রের শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। শিল্পীদের কেবল হাততালিতে নয়, বরং তাদের জীবনধারণের ন্যূনতম নিশ্চয়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, একের পর এক এমন সম্ভাবনাময় প্রাণ ঝরে পড়ার দায় কি সমাজ এড়াতে পারবে?