টেলিভিশন পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বিনোদন জগত। একটি নাটকের দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে প্রাণ হারালেন এই প্রতিভাবান শিল্পী। তবে এই মৃত্যুকে ঘিরে এখন তৈরি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক ও অমীমাংসিত রহস্য, যা ভাবিয়ে তুলছে শুটিং ইউনিটের সকল সদস্যকে।
ঘটনাটি ঘটেছিল একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকের (সিরিয়াল) শুটিং চলাকালীন। সব পরিকল্পনা মতোই চলছিল, কিন্তু হঠাৎ একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তুলেছেন ওই ধারাবাহিকের প্রখ্যাত লেখিকা লীনা গঙ্গোপাধ্যায়। তার দাবি অনুযায়ী, ওই দিনের শুটিংয়ের চিত্রনাট্যে (স্ক্রিপ্ট) গভীর জলে যাওয়ার মতো কোনো বিপজ্জনক দৃশ্যই ছিল না। অভিনেতা কেন এবং কার নির্দেশে গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করলেন, তা নিয়ে এখন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
লীনা গঙ্গোপাধ্যায় অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে সংবাদমাধ্যমকে জানান, শুটিংয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিনেতার কেবল গোড়ালি সমান জলে হাঁটার কথা ছিল। চিত্রনাট্যের কোথাও এমন কোনো নির্দেশনা ছিল না যার জন্য তাকে সমুদ্রের গভীরে যেতে হবে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে বড় কোনো ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না, সেখানে এমন একটি মর্মান্তিক পরিণতি কীভাবে ঘটল।
এই ঘটনায় শোকাতুর লেখিকা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
একই সুর শোনা গেছে ধারাবাহিকের কার্যনির্বাহী প্রযোজকের (শুটিং পরিচালনার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি) কণ্ঠেও। তিনি জানান, সেই দিনের মূল চিত্রগ্রহণের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। সবশেষে কেবল একটি উড়ন্ত ক্যামেরার দৃশ্য (ড্রোন শট) বাকি ছিল। চরিত্রের প্রয়োজনে রাহুল ও তার সহ-অভিনেত্রী শ্বেতাকে গোড়ালি পর্যন্ত জলে নেমে চলাফেরা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দৃশ্যটি ধারণ করার সময় আচমকা সমুদ্রের একটি বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে তাদের ওপর। ঢেউয়ের প্রবল তোড়ে ভারসাম্য হারিয়ে দুজনেই গভীর জলে পড়ে যান।
সেখানে উপস্থিত শুটিং ইউনিটের সদস্যরা জানান, দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই তারা উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সহ-অভিনেত্রী শ্বেতাকে দ্রুত টেনে পাড়ে তোলা সম্ভব হলেও রাহুল ঢেউয়ের টানে কিছুটা গভীরে তলিয়ে যান। এরপর লাইফ বোট (নিরাপত্তা নৌকা) এবং দড়ির সাহায্যে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে রাহুলকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, জল থেকে তোলার সময় রাহুল সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন এবং সবার সাথে কথা বলছিলেন।
প্রাথমিক অবস্থায় তাকে বিপদমুক্ত মনে করা হলেও দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছেই না। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং লেখিকার দাবির মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। চিত্রনাট্যে গভীর জলে যাওয়ার নির্দেশ না থাকা সত্ত্বেও কেন অভিনেতা সেখানে গেলেন, কিংবা ঢেউয়ের তীব্রতা পরিমাপ না করেই কেন এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় চিত্রগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে। শ্যুটিং স্পটে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
অভিনেতা রাহুলের এমন আকস্মিক বিদায়ে তার সহকর্মী ও ভক্তদের মাঝে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। একজন প্রাণবন্ত শিল্পীর এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তারা। শুটিংয়ের রঙিন আলো যে এভাবে অকালে নিভে যাবে, তা ছিল সবার কল্পনার বাইরে।
রাহুলের এই মৃত্যু আমাদের বিনোদন শিল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আবারও বড়সড় কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। শুটিং স্পটে রোমাঞ্চ তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময়ই শিল্পীদের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া হয়, যার পরিণতি মাঝেমধ্যেই এমন ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। চিত্রনাট্যের বাইরে গিয়ে ঝুঁকি নেওয়া কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশের অনিশ্চয়তাকে অবজ্ঞা করার এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। একজন শিল্পীর জীবনের মূল্য যেকোনো সুন্দর দৃশ্যের চেয়ে অনেক বেশি। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রাণ এভাবে অবহেলার শিকার না হয়।