দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাত ৭টার পর বিপণিবিতান বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে চলচ্চিত্র শিল্প। বিশেষ করে ঈদের এই মৌসুমে সন্ধ্যার প্রদর্শনীগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ হারানোর শঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজকরা।
বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি রাত ৭টার পর দেশের সব দোকানপাট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতান (শপিং মল) বন্ধ রাখার নির্দেশনা জারি করেছে। এই নির্দেশনার প্রেক্ষিতে রাজধানীর যমুনা ব্লকবাস্টার সিনেমাসসহ বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহ তাদের সন্ধ্যার প্রদর্শনীগুলো স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উৎসবের মৌসুমে এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে গত রবিবার সন্ধ্যায় চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার শাকিল, তানিম নূর, রেদওয়ান রনি, সাকিব আর খান, রায়হান রাফী, শাহরিন আক্তার সুমি ও শিরিন সুলতানা এক যৌথ বিবৃতি প্রদান করেন। বিবৃতিতে তাঁরা সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী উদ্যোগের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েও সিনেমা হলগুলোকে এই সময়সীমার আওতামুক্ত রাখার সবিনয় দাবি জানান। তাঁদের মতে, সন্ধ্যা ও রাতের সময়টুকুই হলো সিনেমা হলের জন্য সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময় (প্রাইম টাইম)। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে সাধারণ মানুষ সপরিবারে এই সময়েই বিনোদনের খোঁজে প্রেক্ষাগৃহে আসেন। সন্ধ্যা ৭টায় হল বন্ধ করে দিলে বিপুল সংখ্যক দর্শক সিনেমা দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন।
বিবৃতিতে অতীতে প্রচলিত নিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, আগে বিপণিবিতান নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ হলেও প্রেক্ষাগৃহগুলো সাধারণত রাত ১০টা বা প্রদর্শনী শেষ না হওয়া পর্যন্ত চালু রাখার অনুমতি পেত। মার্কেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও সিনেমা হলের কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব, যা অতীতেও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাতা ও প্রযোজকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে কয়েক কোটি টাকার লগ্নি থাকে। ঈদের এই কয়েক দিনই সেই বিনিয়োগ তুলে আনার শ্রেষ্ঠ সময়। যদি এই সময়েই প্রদর্শনী বন্ধ থাকে, তবে প্রযোজকরা পথে বসবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা আরও উল্লেখ করেন যে, গত কয়েক বছরে দর্শক ও শিল্পী-কলাকুশলীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ঢাকাই সিনেমা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নতুন বাংলাদেশে এই অগ্রযাত্রা সচল রাখতে এবং দর্শকদের ঈদের আনন্দ পূর্ণতা দিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও সহমর্মিতামূলক পদক্ষেপ একান্ত প্রয়োজন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার সিনেমা হলগুলোকে সাধারণ দোকানের আওতামুক্ত রেখে পূর্বের ন্যায় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে।
চলচ্চিত্র কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি একটি বিশাল সৃজনশীল শিল্প যেখানে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িত। জ্বালানি সাশ্রয় অবশ্যই জাতীয় কর্তব্য, তবে যে শিল্পটি সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তাকে বিশেষ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিপণিবিতানের নিরাপত্তা বজায় রেখেও যদি প্রেক্ষাগৃহগুলো চালু রাখা যায়, তবে শিল্পটি অকাল মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে। নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানে আসা এখন সময়ের দাবি।