কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে যখন বোরো ধান কাটার মহোৎসব চলার কথা, ঠিক তখনই প্রকৃতি যেন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। গত তিন দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও খোয়াই নদীর উপচে পড়া পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান। চোখের সামনে হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল পানির নিচে চলে যেতে দেখে এখন বুকফাটা আর্তনাদ করছেন হাওরের প্রান্তিক কৃষকেরা।
কিশোরগঞ্জের দিগন্তজোড়া হাওরে এখন কেবলই হাহাকার। জেলার অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইনসহ সাতটি উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। বিশেষ করে অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে খোয়াই নদীর পানি ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক কৃষক তাদের আধপাকা ও পাকা ধান ঘরে তোলার সুযোগটুকুও পাচ্ছেন না।
নিকলী আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের দিনও জেলায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। আবহাওয়া দপ্তরের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক আক্তার ফারুক জানিয়েছেন, বুধবারও বৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে, যা কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করে দিয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। কৃষকেরা জানিয়েছেন, শুধু জমি নয়, ধান শুকানোর খলা (যেখানে ধান মাড়াই ও শুকানো হয়) পানিতে ডুবে গেছে। ফলে যেটুকু ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, সেগুলো মাড়াই বা সংরক্ষণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অষ্টগ্রামের কৃষক ফুল মিয়া বিষণ্ন মনে জানান, শত শত একর জমি এখন পানির নিচে। বৃষ্টির কারণে ধান কাটার যন্ত্র (কম্বাইন হারভেস্টার) চালানো যাচ্ছে না। কাদা ও পানির কারণে শ্রমিকরাও ধান কাটতে অনীহা দেখাচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর কিশোরগঞ্জে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার সিংহভাগই হাওরাঞ্চলে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রায় ৮ লাখ টন চাল উৎপাদনের আশা ছিল সরকারের। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত হাওরের মাত্র অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি অর্ধেক ধান এখনো মাঠেই রয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা পার না করলেও টানা বৃষ্টিতে পানির স্তর দ্রুত বাড়ছে। কৃষি বিভাগ থেকে আগেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই যেন তা দ্রুত কেটে ফেলা হয়। কিন্তু আকস্মিক এই অতিবৃষ্টি কৃষকদের প্রস্তুতির চেয়েও দ্রুত আঘাত হেনেছে। বর্তমানে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে পাঠিয়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ করার কাজ চলছে।
হাওরের অর্থনীতি মূলত একটি মাত্র ফসলের ওপর নির্ভরশীল। বছরের এই একটি সময় কৃষকের শ্রমে-ঘামে উৎপন্ন ধান দিয়েই তাদের সারা বছরের অন্ন ও বস্ত্রের সংস্থান হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ের এই অতিবৃষ্টি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও এক বিশাল হুমকি। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার কাছে আমাদের প্রযুক্তি ও পরিকল্পনা কতটা অসহায়, তা হাওরের এই বর্তমান চিত্র আমাদের আরও একবার ভাবিয়ে তুলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ এবং দ্রুত ধান কাটার জন্য সরকারি সহায়তা এখন সময়ের দাবি।