অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত না করে বাতিলের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে ২০৩০ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কাজ করছে।
গত বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সারোয়ার তুষার দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। ‘অধ্যাদেশ বাতিল এবং গণভোট অস্বীকারের রাজনীতি: সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের যুগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই আলোচনায় তিনি দাবি করেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তিগুলো পুনরায় সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করছে।
সারোয়ার তুষার তাঁর বক্তব্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের তুলনা করে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহারের যে রাস্তা একসময় বিএনপি দেখিয়েছিল, আওয়ামী লীগ পরবর্তী সময়ে তারই চরম বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বা অধ্যাদেশগুলো যখন স্থায়ী আইনে রূপ নেওয়ার কথা, ঠিক তখনই সেগুলোকে বাতিলের তালিকায় রাখা হচ্ছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে আগামী শুক্রবার তথা ১০ এপ্রিলের মধ্যে যদি এগুলো সংসদে পাশ বা আইনে পরিণত না হয়, তবে এর মধ্যে অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই তালিকায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য অধিকারের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। বিশেষ করে গণভোট অধ্যাদেশটি বাতিলের তালিকায় থাকায় জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে নাগরিক সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দাবি, রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং নিয়োগ বা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে, সেই উদ্দেশ্যেই এই সংস্কারগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই অধ্যাদেশগুলোতে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে এবং সেগুলো আরও শক্তিশালী ও পরিমার্জিত আকারে বিল হিসেবে সংসদে উত্থাপন করা হবে। তবে সারোয়ার তুষার মনে করেন, এটি নিছক কালক্ষেপণ এবং ভবিষ্যতে একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা মাত্র।
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মেরুদণ্ড শক্ত করতে হলে স্বাধীন বিচার বিভাগ, কার্যকর মানবাধিকার সংস্থা এবং শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প নেই। অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত না করে বাতিলের পথে হাঁটা কি তবে সেই পুরনো 'সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের' পুনরাবৃত্তি? যদি জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার এই উদ্যোগগুলো আইনি সুরক্ষা না পায়, তবে আগামীর বাংলাদেশ কতটা বৈষম্যহীন হবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ২০৩০ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার এই হিসাব-নিকাশ সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে আবারও অন্ধকারে ঠেলে দেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।