ঢাকার আদালতপাড়ার এক সময়ের চিরচেনা ‘খটখট’ শব্দ এখন ইতিহাস হওয়ার পথে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কাছে হার মেনে স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে টাইপরাইটার। শত শত মানুষের কর্মসংস্থান আর আইনি নথিপত্রের প্রাণভোমরা এই যন্ত্রটি এখন কেবল কয়েকজন প্রবীণ কারিগরের জেদ আর ভালোবাসায় টিকে আছে।
রাজধানীর ঢাকা আইনজীবী সমিতির প্রধান ফটকের পাশে বসলে এখনো কানে আসে ধাতব সেই ঝংকার। সেখানে জরাজীর্ণ টেবিলে পুরোনো এক টাইপরাইটার নিয়ে গভীর মগ্নতায় কাজ করছেন বিমান পাল। চারপাশে আধুনিক কম্পিউটার আর উচ্চগতির প্রিন্টারের ভিড় থাকলেও তিনি যেন এক অন্য সময়ের প্রতিনিধি। দলিলে শব্দ সাজানোর এই ব্যস্ততা এখন আর আগের মতো নেই; যান্ত্রিক গতির কাছে মন্থর হয়ে পড়েছে টাইপরাইটারের ফিতা।
এক সময় আদালতপাড়া মানেই ছিল সারি সারি টাইপরাইটারের রাজত্ব। বিচারপ্রার্থী থেকে শুরু করে আইনজীবী—সবার ভরসা ছিল এই লোহার মেশিনগুলো। তবে গত এক দশকে দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। দ্রুতগতিতে কাজ সম্পন্ন হওয়া এবং এক ক্লিকেই অসংখ্য অনুলিপি (ফটোকপি) তৈরির সুবিধার কারণে মানুষ এখন কম্পিউটারের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। ফলে আদালতপাড়ার সেই কর্মব্যস্ততা এখন কম্পিউটারের কি-বোর্ডের মৃদু শব্দে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টাইপিস্ট সুভাষ পালের গল্পটা বেশ করুণ। ১৯৭৩ সাল থেকে এই পেশায় থাকা সুভাষ জানান, এক সময় আমেরিকা ও জার্মানি থেকে আসা টাইপরাইটার মেশিনের যে মর্যাদা ছিল, তা এখন কল্পনাতীত। সময়ের দাবি মেটাতে সত্তোরোর্ধ্ব এই প্রবীণ ব্যক্তি নিজেও এখন কম্পিউটারে অভ্যস্ত হয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, টাইপরাইটারের রিবন (কালিযুক্ত ফিতা) আর যন্ত্রাংশের তীব্র সংকট চলছে। যন্ত্র নষ্ট হলে সারানোর লোক নেই, নতুন করে এই কাজ শেখার মতো তরুণও নেই। তার নিজের সন্তানরাও এই পেশার অনিশ্চয়তা দেখে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছে।
আদালতপাড়া ঘুরে দেখা যায়, অনেক দোকানেই টাইপরাইটারগুলো ধুলোবালি মেখে পড়ে আছে। কেউ কেউ কেবল স্মৃতির টানে সাজিয়ে রেখেছেন। পরাণ নামের এক টাইপিস্ট জানান, আগে যেখানে মানুষের দীর্ঘ লাইন থাকতো, এখন সেখানে সারাদিন বসে থাকলেও কাজের দেখা মেলে না। প্রবীণ টাইপিস্ট সৌরভ রায়ের মতে, দিনে যেখানে হাজার টাকা আয় হতো, এখন তা নেমে এসেছে চার-পাঁচশ টাকায়। এই সংকট কেবল আর্থিক নয়, এটি একটি পেশার বিলুপ্তির ঘণ্টা।
তবে পুরোপুরি বিলীন হতে এখনো কিছু বাধা রয়ে গেছে। উচ্চ আদালতের আইনজীবী আল কাইয়ুমের মতে, কম্পিউটারের তুলনায় টাইপরাইটারে খরচ অনেক কম। অনেক দরিদ্র বিচারপ্রার্থী এখনো ৫০-৬০ টাকায় কাজ সারতে টাইপরাইটার খোঁজেন। এছাড়া আদালতের অনেক পুরোনো ফরম এখনো ডিজিটাল না হওয়ায় টাইপরাইটারই একমাত্র ভরসা। অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ মক্কেলও এখনো এই পুরোনো পদ্ধতির ছাপানো কাগজে বেশি বিশ্বাস পান। কিন্তু এসবই যেন নিভে যাওয়ার আগে শেষ প্রদীপের আলো।
টাইপরাইটারের এই বিদায় কেবল একটি যন্ত্রের বিদায় নয়, বরং একটি যুগের অবসান। প্রযুক্তি আমাদের গতি দিলেও কেড়ে নিচ্ছে পেশার নান্দনিকতা আর দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, গতির এই প্রতিযোগিতায় আমরা কি কেবল যান্ত্রিকতাকে আপন করছি, নাকি হারিয়ে ফেলছি আমাদের শেকড় আর ঐতিহ্যকেও? পরিবর্তনের এই ধারা অনিবার্য হলেও বিমান পালদের মতো মানুষদের জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিকতার চাকায় অনেক সময় পিষ্ট হয় সাধারণের জীবিকা।