দেশের তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দাবি অনলাইন অর্থ লেনদেনের আন্তর্জাতিক মাধ্যম ‘পেপ্যাল’ বাংলাদেশে চালুর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে জানান, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে সরকার একটি বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ফ্রিল্যান্সার এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে একগুচ্ছ আশাবাদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার কেবল পেপ্যাল চালুর উদ্যোগই নেয়নি, বরং আগামী ৫ বছরে ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) প্রদানের এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল দেশকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশে পেপ্যালের কার্যক্রম আরম্ভ করতে ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তি সম্পন্ন পার্ক (হাই-টেক পার্ক) এবং সফটওয়্যার সেন্টারগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার মাধ্যমে আমরা এই বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থাকে দেশের দোরগোড়ায় নিয়ে আসব।”
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, আগামী ৫ বছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১ হাজার নতুন ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। ইতোমধ্যে সাড়ে সাত হাজার ফ্রিল্যান্সারকে সরকারি পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে, যা তাদের পেশাদার পরিচয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করছে। এছাড়া ২০২৬ সালের মধ্যে ২ হাজার ৪০০ তরুণকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), যন্ত্র শিখন (মেশিন লার্নিং) এবং পরাবাস্তব জগত বা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো উচ্চতর প্রযুক্তিতে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারি সেবা জনগণের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দিতে ৮৩টি সেবা বর্তমানে অনলাইন পোর্টালে প্রদান করা হচ্ছে। আগামী এক বছরে এই তালিকায় আরও ১০টি নতুন সেবা যুক্ত হবে। এছাড়া বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের মাধ্যমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত প্রোগ্রামিং, ডাটা অ্যানালাইটিক্স (উপাত্ত বিশ্লেষণ) এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (শারীরিক বা মানসিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী) মানুষদের স্বাবলম্বী করার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রায় ৭০০ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০০ জন শিক্ষার্থী আইটি প্রশিক্ষণের আওতায় রয়েছেন, যা ২০২৬ সাল নাগাদ আরও সম্প্রসারিত হবে।
বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য পেপ্যাল যেন এক সোনার হরিণ। অনেক বছর ধরে কেবল আশার বাণী শোনানো হলেও কার্যকর কোনো ফল মেলেনি। বর্তমান সরকারের এই নতুন উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে দেশের রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তবে কেবল উদ্যোগ নিলেই হবে না, বরং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারুণ্যের এই অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে আইটি সেবায় অন্যতম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে।