চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা দিনগুলোর প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই বহুল প্রতীক্ষিত মামলার রায় ঘোষণা করবে, যা পুরো জাতির দৃষ্টি কেড়েছে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অকুতোভয় ছাত্র আবু সাঈদ। সেই অদম্য সাহসের দৃশ্য এখন শোষণ আর শৃঙ্খল ভাঙার এক বৈশ্বিক প্রতীক। সেই বীরত্বের স্মারক বহন করা হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ শেষ হয়েছে দীর্ঘ ৫ মাস ২০ দিনের নিরলস প্রচেষ্টায়। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের রায়ে নির্ধারিত হবে এই বর্বরোচিত ঘটনার নেপথ্যে থাকা অপরাধীদের ভাগ্য।
এই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৩০ জন, যা ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে একটি মামলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক আসামির রেকর্ড। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ, রংপুরের সাবেক পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, চারজন শিক্ষক, আটজন পুলিশ সদস্য এবং ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা- কর্মচারী। গত বছরের ৬ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছিল। বিচার চলাকালীন মোট ২৫ জন প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি (চিফ প্রসিকিউটর) আমিনুল ইসলাম অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন যে, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, “তদন্তে আমরা অকাট্য এবং সন্দেহাতীত প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। যেহেতু অপরাধগুলো প্রমাণ করা গেছে, তাই আমরা বিশ্বাস করি আসামিরা যথাযথ আইনি দণ্ড পাবেন।”
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ভিন্ন দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আবু সাঈদের মাথায় লাঠির আঘাতের কথা উল্লেখ থাকলেও সরাসরি গুলির চিহ্ন ছিল না বলে তারা দাবি করছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু যুক্তি দেখিয়েছেন যে, প্রধান তথ্য-প্রমাণে কিছু ঘাটতি থাকায় এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন অভিযুক্তের নাম বাদ পড়ায় তারা তাদের মক্কেলদের নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আশা করছেন।
ইতিমধ্যেই আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছে ট্রাইব্যুনাল-১। তবে আগামীকাল ট্রাইব্যুনাল-২ এর রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে, সেদিন ঠিক কাদের সরাসরি আঘাতে রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিলেন এই বীর শিক্ষার্থী।
আবু সাঈদ কেবল একজন তরুণ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের এক জীবন্ত মূর্ত প্রতীক। তার হত্যার বিচার কেবল একটি পরিবারের আইনি লড়াই নয়, বরং এটি জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি শহীদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতির নামান্তর। রাজপথে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার সেই অকল্পনীয় সাহস সেদিন পুরো জাতিকে জাগিয়ে দিয়েছিল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে অপরাধীরা যদি তাদের উপযুক্ত দণ্ড পায়, তবেই শহীদ আবু সাঈদের আত্মা শান্তি পাবে এবং আগামীর বাংলাদেশে যে কেউ সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হওয়ার আগে সহস্রবার ভাববে।