দেশে হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা ক্রমেই বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিভাগে আরও সাতটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে এই ছোঁয়াচে রোগের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৮২ জন শিশু, যা জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। সোমবার বিকেলে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ৫ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ৬ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া সাতটি শিশুই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১১৮ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এই অল্প সময়ের ব্যবধানে ৫ হাজার ৯৪০ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৯ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগ বর্তমানে এই রোগের মূল উপকেন্দ্র (এপিসেন্টার) হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হওয়া ১৮০ জন রোগীর মধ্যে ১৩৮ জনই এই বিভাগের। মৃত্যুর ঘটনাগুলোও কেবল ঢাকা বিভাগেই সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে, গত একদিনে ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন কোনো রোগী শনাক্ত না হওয়াটা কিছুটা স্বস্তির খবর। ঢাকা বিভাগের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০ জন করে রোগী পাওয়া গেছে বরিশাল ও চট্টগ্রামে। এ ছাড়া খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও রংপুরেও নতুন করে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হচ্ছে। ছয় মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো টিকা না দেওয়া এবং রোগ প্রতিরোধের অভাবই এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আলাদা রাখা (আইসোলেশন) এবং সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুর প্রাণহানি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। গত কয়েক বছরের টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতিই আজ আমাদের এই সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সরকারের বর্তমান বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি প্রশংসনীয় হলেও, এটি যেন কেবল শহরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। গ্রামীণ ও দুর্গম জনপদের প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। শিশুদের জীবন বাঁচাতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ—উভয়কেই এখন সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।