কক্সবাজারে টানা অতি ভারী বর্ষণের কারণে আবারও পাহাড়ধসের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এতে মাটির নিচে চাপা পড়ে লিমা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার স্বামী জসিম উদ্দিন (৩০) গুরুতর আহত হয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দরিয়ানগর বড়ছড়া হাজীঘোনা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত লিমা আক্তার ও তার স্বামী জসিম উদ্দিন ঝিলংজা ইউনিয়নের দরিয়ানগর বড়ছড়া এলাকার বাসিন্দা। এই দম্পতির সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা দুজনে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে পর্যটকদের কাছে তেলের ভাজা মাছ (যা স্থানীয়ভাবে ফিশ ফ্রাই নামে পরিচিত) বিক্রি করে অত্যন্ত কষ্ট করে সংসার চালাতেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত কয়েকদিন ধরে কক্সবাজার জেলায় অবিরাম মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুরে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেলে পাহাড়ের মাটির একটি বড় অংশ হঠাৎ ধসে পাশে থাকা জসিমের কাঁচা বসতবাড়ির ওপর পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। এতে ভেতরে থাকা লিমা ও জসিম মাটির নিচে আটকে পড়েন। শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং মাটি সরিয়ে তাদের উদ্ধারে হাত লাগান। পরে দুজনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক লিমা আক্তারকে মৃত ঘোষণা করেন। জসিমের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী পাহাড়ধসে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় দমকল বাহিনী তথা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, পাহাড়ের নিচে অন্য কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। তবে পরবর্তীতে আর কোনো হতাহত বা আটকে থাকা ব্যক্তির সন্ধান মেলেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে ঘটনার পরপরই দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত বেশ কয়েকটি পরিবারকে অন্যত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ইউএনও তাহমিনা আক্তার বলেন, "টানা ভারী বর্ষণের ফলে কক্সবাজারের বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকায় ভূমিধসের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দরিয়ানগরে পাহাড়ধসে হতাহতের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। পাহাড়ের পাদদেশে যারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন, তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দমকল বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।"
কক্সবাজারের পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুমে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করার কারণেই বছরের পর বছর ধরে এমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। পাহাড় রক্ষা এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা হলে এই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয়।