ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত, চারদিকে কাদা আর জলাভূমি। এর মধ্যেই পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছিল একাধিক মামলার আসামি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; খোদ পুলিশ সদস্যরা জীবন বাজি রেখে কর্দমাক্ত জমিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শেষমেশ কবজায় আনলেন পলাতক ডাকাত মুর্শিদকে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় এক চাঞ্চল্যকর অভিযানে পাঁচ পুলিশ সদস্যের বীরত্বে ধরা পড়েছে কুখ্যাত ডাকাত মুর্শিদ মোল্লা ওরফে মোরশেদ। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) গভীর রাতে উপজেলার বুধন্তী ইউনিয়নের কেনা গ্রামে এই রুদ্ধশ্বাস ঘটনাটি ঘটে। গ্রেফতারকৃত মুর্শিদ ওই গ্রামেরই চেনু মোল্লার ছেলে। দীর্ঘদিনের পলাতক এই আসামিকে ধরতে পুলিশকে আক্ষরিক অর্থেই ঘাম ও কাদা—উভয়ই ঝরাতে হয়েছে
।
ইসলামপুর পুলিশ ফাঁড়ির একটি বিশেষ দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, কেনা গ্রাম এলাকায় আত্মগোপন করে আছে ওয়ারেন্টভুক্ত (গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া) আসামি মুর্শিদ। খবর পেয়েই রাত সাড়ে ১২টার দিকে অভিযানে নামে পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই ধূর্ত মুর্শিদ দৌড়ে পালাবার চেষ্টা করে। সাধারণ রাস্তা ছেড়ে সে পাশের নিচু বিলের কর্দমাক্ত জমিতে নেমে যায়। প্রায় আধা কিলোমিটার পথ তাকে ধাওয়া করেন পাঁচ পুলিশ সদস্য।
কাদা আর পানির বাধা উপেক্ষা করে পুলিশ সদস্যরাও তার পিছু পিছু জমিতে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে মুর্শিদের কাছাকাছি পৌঁছালে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। কর্দমাক্ত জমিতে গড়াগড়ি খেয়ে পুলিশের পোশাক ও শরীর সম্পূর্ণ কাদায় মাখামাখি হয়ে গেলেও তারা লক্ষ্যভ্রষ্ট হননি। শেষ পর্যন্ত সুঠামদেহী মুর্শিদকে কাবু করে শিকল পরাতে সক্ষম হন তারা। পুলিশ জানায়, মুর্শিদের বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি এবং ডাকাতির প্রস্তুতির মতো অত্যন্ত গুরুতর তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
অভিযান পরিচালনাকারী উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলী রেজা মামুন জানান, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সব সময় সর্বোচ্চটা দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, "সে নিজেকে বাঁচাতে যখন কর্দমাক্ত জমিতে নেমে যায়, আমরাও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তার পেছনে ধাওয়া করি। প্রায় আধা কিলোমিটারের বেশি দৌঁড়ানোর পর তাকে আমরা কবজায় আনি। আমাদের সবার শরীরে তখন প্রচুর কাদা লেগে ছিল, কিন্তু আসামিকে ধরতে পারায় সেই ক্লান্তি মুছে গেছে।"
বিজয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মুর্শিদ অত্যন্ত ধূর্ত এবং শক্তিশালী ছিল। তাকে ধরতে পুলিশের এই আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অপরাধী যতই ধূর্ত হোক না কেন, আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া অসম্ভব। প্রতিকূল পরিবেশেও পুলিশ সদস্যদের এই পেশাদারিত্ব ও একাগ্রতা সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার ভরসা জোগায়। কর্দমাক্ত শরীরে হাস্যোজ্জ্বল সেই পুলিশ সদস্যদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ প্রশংসিত হচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে।