কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীকে নৃশংসভাবে হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা দীর্ঘ উদ্বেগের পর স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে নিহতের পরিবার ও সহকর্মীদের মাঝে।
হত্যার নেপথ্যে কী? র্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে সাফল্য
গত শুক্রবার রাতে নিখোঁজ হওয়ার পর শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত মরদেহ। এই ঘটনার পর থেকেই ছায়া তদন্ত শুরু করে র্যাব। সোমবার (২৭ এপ্রিল) সকালে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী নিশ্চিত করেন যে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত মূল পাঁচ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিকেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হলেও প্রাথমিক সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাইকারী বা কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের কবলে পড়েছিলেন এই তরুণ কর্মকর্তা। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার সন্তান বুলেট বৈরাগী ৪১তম বিসিএস (নন-ক্যাডার) পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। মেধাবী এই কর্মকর্তার এমন অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার কর্মস্থল ও নিজ এলাকায়।
শেষ কথোপকথন ও মর্মান্তিক পরিণতি
নিহতের পারিবার ও কাস্টমস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রামে ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ (পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির মৌলিক কোর্স) শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে ছিলেন। গত ১১ এপ্রিল তিনি প্রশিক্ষণে যান এবং শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে বাসে করে রওনা দেন। বাসে থাকাকালীন তিনি নিয়মিত পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন।
সবশেষ রাত ১টা ২৫ মিনিটে তিনি তার স্ত্রীকে জানান যে, তিনি কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছেন এবং সেখান থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন। কিন্তু এরপর থেকেই তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিবারের আশঙ্কা সত্যি করে পরদিন শনিবার সকালে মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় আইরিশ হোটেলের পাশ থেকে তার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তদন্তের গতি ও বিচারপ্রক্রিয়া
কাস্টমস কমিশনার আবদুল মান্নান এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, বুলেট বৈরাগীকে শ্বাসরোধ করে বা আঘাত করে হত্যার পর নির্জন স্থানে ফেলে রাখা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃত পাঁচজনের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জাম বা লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বর্তমানে ধৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা পেশাদার অপরাধী কি না অথবা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। কুমিল্লার পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে নিজ শহরেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে গভীর রাতে মহাসড়ক ও শহরের প্রবেশপথগুলোতে টহল পুলিশের অনুপস্থিতি বা অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা উদ্বেগের বিষয়। বিসিএস ক্যাডার বা নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের মতো দক্ষ জনবল হারানো রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এই ঘটনার দ্রুত বিচার ও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধীদের সাহস আরও বাড়বে। একইসাথে সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের পথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।