গোপালগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব, যার প্রধান শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় জেলাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হাসপাতালে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
গোপালগঞ্জ জেলায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হামের সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২০ জন ব্যক্তি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৩৩৬ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় (উন্নত মানের গবেষণাগার পরীক্ষা) ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনের শরীরে হামের জীবাণুর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশই শিশু হওয়ায় অভিভাবক মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বর্তমানে জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মোট ৬৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালেই ভর্তি আছেন ১৩ জন। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ পৃথকীকরণ কক্ষ বা আইসোলেশন ওয়ার্ড (সংক্রামক রোগীদের জন্য আলাদা চিকিৎসার স্থান) খোলা হয়েছে। তবে যাদের শরীরে রোগের লক্ষণ সামান্য, তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ দিয়ে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
হামের এই বিস্তারের মধ্যেই দোসর হয়ে দাঁড়িয়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালে ভর্তি থাকা শিশু ও সাধারণ রোগীরা অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সময় জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা শিশুদের কষ্ট দেখার মতো নয় বলে জানিয়েছেন তারা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত ১৮২ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে এর মাঝেই মুকসুদপুর উপজেলায় একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যদিও গবেষণাগারের চূড়ান্ত ফলাফলের অভাবে তা আনুষ্ঠানিকভাবে হামের কারণে মৃত্যু বলে নিশ্চিত করা হয়নি।
গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জন চিকিৎসক আবু সাইদ মোহাম্মদ ফারুক জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তিনি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, হাম একটি প্রচণ্ড ছোঁয়াচে বা একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো রোগ হলেও সময়মতো প্রতিষেধক টিকা নিশ্চিত করতে পারলে এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় রাখা এবং রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ জানান।
হামের মতো ছোঁয়াচে রোগ যখন মহামারির রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়, তখন সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প থাকে না। একদিকে যেমন স্বাস্থ্য বিভাগকে শিশুদের দোরগোড়ায় টিকা পৌঁছে দিতে হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগকে অন্তত হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে কেবল ওষুধের মাধ্যমে রোগ নিরাময় কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো এবং গুজব রোধ করা এই মুহূর্তে গোপালগঞ্জের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ।