সিলেটে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু দেখে পাথর হয়ে গেছে ৯ বছরের এক শিশু। স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবার মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ি যাওয়ার আনন্দ মুহূর্তে বিষাদে রূপ নেয়, যখন একটি মালবাহী যানের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে চিরতরে না ফেরার দেশে চলে যান আজিজুর রহমান জুনেল।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার বাইপাস সড়কে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। নিহত আজিজুর রহমান জুনেল (৪৫) সিলেট মহানগর তাঁতি দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন এবং জিন্দাবাজারের কাজী ম্যানশনে ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে ছেলে লাবিবকে স্কুল থেকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন জুনেল। লাবিব স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। তেলিবাজার বাইপাস সড়কে পৌঁছানোর পর সামনের দিকে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি বোঝাই একটি লম্বা মালবাহী যানকে (লং ভেহিকল) অতিক্রম বা ওভারটেক করার চেষ্টা করেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার একটি বড় গর্তে পড়ে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন জুনেল। মুহূর্তের মধ্যে তিনি ছিটকে পড়েন সেই বিশাল যানটির চাকার নিচে।
ঘটনার আকস্মিকতায় মোটরসাইকেল থেকে পাশের রাস্তায় ছিটকে পড়ে আহত হয় শিশু লাবিব। তবে শারীরিক ক্ষতের চেয়েও তার মানসিক আঘাত ছিল প্রবল। চোখের সামনে বাবাকে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে সে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ (কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলা) হয়ে যায়। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে লাবিবকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালেও জুনেলকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তার দেহ ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নুল হাসান অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, দুর্ঘটনার সময় জুনেলের মাথায় কোনো শিরস্ত্রাণ (হেলমেট) ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় চালকদের বলি শিরস্ত্রাণ পরার জন্য। এটি জীবন রক্ষা করে। আজ যদি জুনেল সাহেবের মাথায় শিরস্ত্রাণ থাকত, তবে হয়তো এই বড় দুর্ঘটনাটি এড়ানো যেত বা আঘাতের মাত্রা কম হতো। ছোট্ট এই শিশুটির জীবনের যে ক্ষতি হলো, তা অপূরণীয়।’
দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুজ্জামান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ঘাতক যানটি শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জিন্দাবাজার ব্যবসায়ী মহলেও জুনেলের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
একটি হেলমেটের অনুপস্থিতি এবং রাস্তার একটি গর্ত—এই দুইয়ের সমন্বয়ে আজ একটি সাজানো পরিবার তছনছ হয়ে গেল। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের সচেতনতা কি কেবল পুলিশি জরিমানার ভয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে? বাবার মৃত্যু দেখে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শিশু লাবিবের সেই নিষ্পাপ দৃষ্টি যেন আজ আমাদের পুরো রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। সড়কের বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা রোধে আমরা আর কত প্রাণ বিসর্জন দেব?