সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে আবারও নতুন করে পরীক্ষায় বসতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে আয়োজিত বিশেষ মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই কেবল তারা শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগদানের সুযোগ পাবেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) সূত্রে জানা গেছে, সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষ মূল্যায়ন পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই মডিউলটি শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে এবং উচ্চপর্যায়ের সভার মাধ্যমে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রশিক্ষণ চলাকালীন এবং প্রশিক্ষণ পরবর্তী—এই দুই ধাপে শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাই করা হবে। প্রশিক্ষণটি পরিচালিত হবে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) মাধ্যমে। সাধারণত পিটিআইয়ের প্রশিক্ষণ ১০ মাসের হলেও, সুপারিশপ্রাপ্তদের জন্য এটি দুই থেকে তিন মাসের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে সম্পন্ন হবে। প্রশিক্ষণ চলাকালীন পিটিআই কর্তৃপক্ষ প্রার্থীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করবে। এরপর প্রশিক্ষণ শেষে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করবে, যার ভিত্তিতে চূড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এই দুই ধাপের মূল্যায়নের ফলাফল বিশ্লেষণ করেই মন্ত্রণালয় যোগদানের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
এ বিষয়ে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ জানান, প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা পদ্ধতির রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সভার পর এটি চূড়ান্ত করা হবে। চূড়ান্ত হওয়ার আগে পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানানো সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১টি জেলায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত ৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়, যেখানে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এবং নিয়োগ চূড়ান্ত না হওয়ায় সুপারিশপ্রাপ্তরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে তারা রাজধানীতে নিয়োগের দাবিতে আন্দোলনও করেন। পরে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়, প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার পরই তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যকর করা হবে।
নিয়োগের এই নতুন ধাপ নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যারা চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ছিলেন, তাদের জন্য এই নতুন পরীক্ষা বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের মতে, শিক্ষকদের গুণগত মান নিশ্চিত করতেই এই কঠোর মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হচ্ছে।
শিক্ষকতা একটি জাতির মেরুদণ্ড গড়ার কারিগরি কাজ। একজন শিক্ষকের মানোন্নয়নে রাষ্ট্রের বাড়তি সতর্কতা ইতিবাচক হলেও, নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া মেধাবীদের জন্য হতাশাজনক। একবার লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার দীর্ঘ বৈতরণী পার হওয়ার পর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া যেমন স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে, তেমনি তা নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও বাড়িয়ে দেয়। এটি নিয়োগ প্রার্থীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলতে পারে। তাই এই মূল্যায়ন পদ্ধতি যেন নিছক আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে, সেদিকে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। একইসঙ্গে নিয়োগ প্রত্যাশীদের অনিশ্চয়তা দূর করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই পরীক্ষা সম্পন্ন করা বাঞ্ছনীয়।