জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে নির্বাচন কমিশন। এখন থেকে পরিচয়পত্র নিবন্ধনের সময় মা-বাবা ও স্বামী বা স্ত্রীর নাম বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতেও সংরক্ষণ করা হবে, যা ভবিষ্যতে নাগরিকদের নানাবিধ দাপ্তরিক বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দেবে।
নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নাগরিকদের তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে এবং সেবা প্রাপ্তি সহজতর করতে পরিচয়পত্র তৈরির ফরমে বেশ কিছু নতুন ঘর যুক্ত করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক সাইফুল ইসলাম এই নতুন পরিকল্পনার আদ্যোপান্ত গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তিনি জানান, বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্রে আবেদনকারীর নিজের নাম ইংরেজি ও বাংলায় থাকলেও মা-বাবা কিংবা জীবনসঙ্গীর নাম কেবল বাংলায় থাকে। এর ফলে বিদেশে গমনেচ্ছু কিংবা দাপ্তরিক প্রয়োজনে তথ্য যাচাইয়ের সময় সাধারণ মানুষকে অনেক ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় তথ্যের গরমিল দূর করতে সংশোধনের আবেদনের সময় অসত্য তথ্যের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। এসব সমস্যা চিরতরে দূর করতেই এই উদ্যোগ।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিবন্ধন ফরমে (২ নম্বর ফরম) এখন থেকে মা-বাবা ও স্বামী-স্ত্রীর নাম ইংরেজি বানানে লেখার সুযোগ থাকবে। শুধু তাই নয়, দাপ্তরিক নামের পাশাপাশি নাগরিকদের ‘ডাকনাম’ও এই তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত করার কথা ভাবছে কমিশন। তবে পরিচালক সাইফুল ইসলাম একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন যে, এই ইংরেজি নামগুলো নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে (সার্ভার) সংরক্ষিত থাকবে, তা সরাসরি প্লাস্টিকের পরিচয়পত্রের ওপর মুদ্রিত বা দৃশ্যমান থাকবে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনার কাজ চলছে।
আগের মহাপরিচালক এ এ এস এম হুমায়ূন কবীরের সময়কালেই এই প্রস্তাবটি কমিশনের অনুমোদনের জন্য তোলা হয়েছিল। কমিশন নীতিগতভাবে এতে সায় দেওয়ায় এখন চূড়ান্ত বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এছাড়া ভোটার তালিকায় ভিনদেশি বা ভুয়া ভোটারদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আরও একটি কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে কমিশন। এখন থেকে নতুন ভোটার হওয়ার ক্ষেত্রে এলাকার কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এই ‘বিশিষ্ট ব্যক্তি’ হিসেবে গণ্য হবেন স্থানীয় শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা সামাজিকভাবে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বরা। এর ফলে নাগরিক তথ্যের শুদ্ধতা যেমন বাড়বে, তেমনি কোনো বিদেশী নাগরিক প্রতারণার মাধ্যমে ভোটার হতে চাইলে তা শুরুতেই রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে, জাতীয় পরিচয়পত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে পাঠ্যপুস্তকে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইসি মনে করছে, পরিচয়পত্র বা ভোটার তালিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও অনেক অস্পষ্টতা রয়েছে। আবেদন পদ্ধতি বা তথ্যের ভুলের কারণে যে ভোগান্তি হয়, সে সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা যদি আগে থেকেই পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এই ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।
পরিচয়পত্রে মা-বাবা ও স্বামী-স্ত্রীর নাম ইংরেজিতে সংরক্ষণের সিদ্ধান্তটি আধুনিক সময়ের চাহিদার সাথে অত্যন্ত সংগতিপূর্ণ। এটি কেবল বিড়ম্বনাই কমাবে না, বরং আমাদের জাতীয় তথ্যভাণ্ডারকে আরও বেশি বিশ্বস্ত করে তুলবে। তবে তথ্যের শুদ্ধতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এই তথ্য যেন হ্যাকার বা অসাধু চক্রের হাতে না পড়ে, সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে নির্বাচন কমিশনের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ।