দেশের আর্থিক সম্পদ রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারে সাধারণ মানুষকে রাজপথে গর্জে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনস্বার্থ রক্ষায় তার দল রাজপথে সক্রিয় থাকবে এবং জনগণের পাশে থাকবে বলে তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারস্থ আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান সমসাময়িক রাজনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি, বরং ভোটাধিকার নিয়ে এক ধরনের প্রহসন চালানো হয়েছে। তার মতে, নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া হয়েছিল কেবল সুস্থ রাজনীতির ধারা অব্যাহত রাখার বৃহত্তর স্বার্থে, কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের রায়ের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি বা প্রকৌশল (ইঞ্জিনিয়ারিং) করার মাধ্যমে জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে পদদলিত করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের একজন বর্তমান মন্ত্রী এবং একজন সাবেক উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেই এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, নির্বাচনের সময় পর্দার অন্তরালে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল। ডা. শফিকুর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সংবিধানকে নিজেদের ইচ্ছামতো সংশোধন করে দেশে পুনরায় ফ্যাসিবাদী (স্বৈরাচারী ও নিপীড়ক) শাসন কায়েম করতে চাইছে।
সংসদে বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধ করার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিরোধী দলের সদস্যদের গঠনমূলক আলোচনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদে কোনো নোটিশ দেওয়া হলে তা সরাসরি নাকচ করে দেওয়া হচ্ছে। এই অগণতান্ত্রিক পরিবেশের কারণেই ১১ দলীয় ঐক্যজোট জনস্বার্থ রক্ষায় রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, অতীতের ফ্যাসিবাদের চেয়ে এই 'নব্য ফ্যাসিবাদ' আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে, যার প্রমাণ মেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নগ্ন দলীয়করণের মাধ্যমে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, বর্তমানে সংবাদপত্রের টুঁটি চেপে ধরে সত্য প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "সাদাকে সাদা বলুন, কোনো কিছু অতিরঞ্জিত করবেন না। আমাদের বক্তব্যের কোনো অংশ বিশেষ বা খণ্ডিত অংশ প্রচার না করে হয় পুরোটা প্রচার করুন, না হয় প্রচার থেকে বিরত থাকুন।" তিনি সংবাদমাধ্যমকে নিরপেক্ষ থেকে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার অনুরোধ জানান।
সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে তিনি দেশের সম্পদ রক্ষায় দেশবাসীকে সজাগ হওয়ার আহ্বান জানান। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের অর্থ ও সম্পদ কুক্ষিগত করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা রুখতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। জনগণের এই ন্যাসংগত লড়াইয়ে জামায়াতে ইসলামী রাজপথ ও সংসদ—উভয় ক্ষেত্রেই সরব ভূমিকা পালন করবে এবং সর্বদা সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে।
ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। জামায়াত আমিরের এই রাজপথে নামার ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দান আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। জনগণের ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।