প্রকৃতির রুদ্ররূপে মুহূর্তেই ছারখার হয়ে গেল একটি সাজানো সংসার। জামালপুরের মেলান্দহে গভীর রাতে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে বসতঘরের ওপর বিশাল গাছ উপড়ে পড়ে একই পরিবারের তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছে। ঘুমের ঘোরেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বৃদ্ধ মা ও তার দুই সন্তান।
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় রোববার দিবাগত রাতে আঘাত হানা কালবৈশাখী ঝড় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের পূর্ব দাগী গ্রামে রাত সাড়ে তিনটার দিকে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঝড়ের তীব্রতায় একটি বিশাল মেহগনি গাছ উপড়ে বসতঘরের ওপর পড়লে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় একই বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা মা ও দুই মেয়ের।
নিহতরা হলেন পূর্ব দাগী এলাকার মৃত গনি মণ্ডলের স্ত্রী খুকি বেগম (৬৫), তার বড় মেয়ে ফরিদা আক্তার (৪০) এবং ছোট মেয়ে ফতে আক্তার (৩৭)। সোমবার সকালে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা) জিন্নাতুল আরা এই হৃদয়বিদারক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দমকল বাহিনী (ফায়ার সার্ভিস) সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাত থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল। শেষ রাতের দিকে হঠাৎ দমকা হাওয়ার সাথে প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। সে সময় খুকি বেগম তার দুই মেয়েকে নিয়ে টিনের ঘরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ ঘরের পাশে থাকা একটি বিশাল মেহগনি গাছ শিকড়সহ উপড়ে সরাসরি তাদের শোয়ার ঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। ভারি গাছের চাপে টিনের ঘরটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ভেতরে থাকা তিনজনই গাছের নিচে আটকা পড়েন। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
ভয়াবহ ঝোড়ো আবহাওয়া এবং অন্ধকারের কারণে রাতে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা সম্ভব হয়নি। সকাল হওয়ার পর স্থানীয় প্রতিবেশীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে মরদেহগুলো দেখতে পান। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ভারি গাছ সরিয়ে মা ও দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিন্নাতুল আরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সরকারিভাবে সহায়তা প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে। এলাকায় এখন শোকের ছায়া বিরাজ করছে এবং শোকার্ত স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
কালবৈশাখীর মৌসুমে প্রতি বছরই আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে কাঁচা বা আধাপাকা ঘরের ওপর গাছ পড়ে এমন প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বসতবাড়ির একদম গা ঘেঁষে বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ গাছ রাখা যে কতটা বিপদজনক হতে পারে, মেলান্দহের এই ঘটনাটি তার আরও একটি করুণ উদাহরণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ রোধ করা মানুষের সাধ্যের বাইরে হলেও, বাসস্থানের চারপাশে গাছের অবস্থান নিয়ে সচেতনতা হয়তো এমন অকাল মৃত্যু কমাতে সহায়ক হতে পারে। তিনটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই ক্ষতি কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।