সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) জিয়াউল আহসানের নির্দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে হত্যা ও লাশ গুমের চাঞ্চল্যকর বিবরণ উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। রোববার (২১ জুন) বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১-এ জিয়ার সাবেক রানার (সহকারী) ইমরুল কায়েস সহযোগী সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করাসহ অসংখ্য নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিশদ বর্ণনা দেন তিনি।
সাক্ষী ইমরুল কায়েস জানান, ২০১২ সালের এপ্রিলে র্যাব (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) সদরদপ্তর থেকে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে একটি দল মহাখালী এলাকায় যায়। পরে তিনি সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানতে পারেন যে, সেখান থেকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর প্রমাণ নষ্ট করতে অস্ত্রের ‘ইন-আউট রেজিস্টার’ (অস্ত্র আনা-নেওয়ার খাতা) এবং সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা) ফুটেজ ধ্বংস করেন জিয়াউল আহসান। জবানবন্দিতে সাক্ষী আরও বলেন, জিয়াউল আহসান ফোনে ‘তারেক স্যার’ নামক একজনকে বলছিলেন, “আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে ‘গলফ’ (প্রতীকী অর্থে গর্তে ফেলা বা গুম করা) করলাম।”
জবানবন্দিতে গুম ও হত্যার লোমহর্ষক সব পন্থার কথা উঠে আসে। বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) বিদ্রোহের পর ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’-এর নামে ৮-১০ জন সদস্যকে ইনজেকশন দিয়ে অথবা পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে বুড়িগঙ্গা নদীতে সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বেঁধে ফেলে হত্যা করা হয়। এছাড়া সুন্দরবনে সাজানো অভিযান, উত্তরায় সাজানো বন্দুকযুদ্ধ (ক্রসফায়ার), কাঁচপুর ব্রিজে টার্গেটের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলা এবং বরিশালের পাথরঘাটায় বলেশ্বর নদীর মোহনায় পেট চিরে লাশ গুম করার মতো ভয়ঙ্কর সব অপরাধের বিবরণ দেন সাক্ষী। ইমরুল বলেন, "জিয়াউল আহসান স্যার এক বছর তিন-চার মাস সময়ে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন।"
সাক্ষ্যপ্রদান শেষে বর্তমানে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েস নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ইমরুল মূলত জিয়াউল আহসানের আদেশে লাশ সরানোর কাজে বাধ্য হয়েছিলেন, তাই তাঁকে আসামি না করে ‘অ্যাকমপ্লিস উইটনেস’ (সহযোগী সাক্ষী) হিসেবে আদালতে হাজির করা হয়েছে। জবানবন্দি চলাকালে আদালতে উপস্থিত অভিযুক্ত জিয়াউল আহসানকে নির্বিকার ও হাস্যোজ্জ্বল দেখা গেছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে র্যাবে যোগ দেওয়া জিয়াউল আহসান পরবর্তীতে এনএসআই (জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা) ও এনটিএমসি-র (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার) শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বিগত সরকারের আমলে গুম-খুন ও ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালায় নির্যাতনে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগে গত বছরের আগস্টে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।