রাজমিস্ত্রির কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণের সাত দিন পর অবশেষে টেকনাফের দুর্গম পাহাড় থেকে তিন যুবককে জীবিত উদ্ধার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি থাকা এই যুবকদের উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কক্সবাজারের টেকনাফে এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানের মাধ্যমে অপহরণের সাত দিন পর তিন যুবককে উদ্ধার করেছে র্যাব-১৫। শুক্রবার বেলা ১১টায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সাফল্যের তথ্য নিশ্চিত করেছেন র্যাবের সহকারী পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম) আ. ম. ফারুক। উদ্ধারকৃত ব্যক্তিরা হলেন কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের লিংক রোড সংলগ্ন দক্ষিণ মুহুরীপাড়া এলাকার জাকির আহাম্মদ (৪২), নুর হোসেন (২২) ও আয়াত উল্যাহ (২২)।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১০ এপ্রিল, শুক্রবার দুপুরে। রাজমিস্ত্রির কাজের ভালো মজুরির লোভ দেখিয়ে অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজন ব্যক্তি এই তিনজনকে টেকনাফ বাসস্ট্যান্ড মোড়ে ডেকে আনে। তারা সরল বিশ্বাসে সেখানে পৌঁছালে কৌশলে তাদের একটি অটোরিকশায় (তিন চাকার যান) তুলে নেওয়া হয়। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় টেকনাফের রাজারছড়া এলাকার করাচীপাড়া সংলগ্ন গহীন পাহাড়ে। সেখানে পৌঁছানোর পরই বদলে যায় অপহরণকারীদের রূপ। তিন যুবককে জিম্মি করে শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন।
অপহরণকারীরা ভুক্তভোগীদের মুঠোফোন ব্যবহার করে তাদের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবিকৃত টাকা না দিলে তাদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। অসহায় পরিবারগুলো উপায়ান্তর না দেখে গত ১২ এপ্রিল কক্সবাজার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (থানায় লিখিত প্রাথমিক তথ্য) করেন। বিষয়টি র্যাব-১৫-কে জানানো হলে তারা অপহৃতদের উদ্ধারে ছায়া তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গহীন অরণ্যে গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে।
অভিযানের বর্ণনা দিয়ে র্যাব কর্মকর্তা আ. ম. ফারুক জানান, অপহরণকারীদের অবস্থান শনাক্ত করার পর গত ১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের করাচীপাড়া ও হ্নীলা বাজার এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। র্যাবের শক্তিশালী দলের উপস্থিতি টের পেয়ে এবং গ্রেপ্তারের ভয়ে অপহরণকারীরা অপহৃতদের পাহাড়ে ফেলেই গহীন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে পরিশ্রান্ত ও আতঙ্কিত অবস্থায় জাকির, নুর হোসেন ও আয়াত উল্যাহকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে র্যাব সদস্যরা।
উদ্ধারের পর যুবকদের প্রাথমিক সেবা প্রদান করা হয়েছে এবং আজ শুক্রবার তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দীর্ঘ সাত দিনের দুঃসহ বন্দিদশা কাটিয়ে স্বজনদের কাছে ফিরতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভুক্তভোগীরা। তবে অপহরণচক্রের সদস্যরা এখনো পলাতক রয়েছে। র্যাব জানিয়েছে, দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে গহীন পাহাড়ে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে কাজের লোভ দেখিয়ে এভাবে অপহরণ করা আমাদের সমাজের এক গভীর ক্ষতের দিকে আঙুল তোলে। টেকনাফের দুর্গম পাহাড়গুলো অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা হয়ে উঠছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। সাধারণ মানুষের উচিত অপরিচিত কারোর প্রলোভনে পা দেওয়ার আগে সচেতন হওয়া এবং কর্মস্থলের সত্যতা যাচাই করা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই সাফল্য প্রশংসনীয় হলেও, এই ধরনের অপহরণকারী চক্রের মূল উৎপাটন করা জরুরি যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন বিভীষিকার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।