াজধানীর বাড্ডায় নিজ বাসা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় তাঁর বিভাগের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উদ্ধারকৃত চিরকুট ও মোবাইল ফোনের তথ্যের ভিত্তিতে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা ক্যাম্পাস ও সুধীসমাজে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক ও রহস্যের দানা বেঁধেছে। রোববার রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বাসভবন থেকে পুলিশ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও, উদ্ধারকৃত আলামতগুলো ভিন্ন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মিমোর কক্ষ তল্লাশিকালে একটি হাতে লেখা চিরকুট (সুইসাইড নোট) উদ্ধার করা হয়। সেখানে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় তাঁর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তী ও এক সহপাঠীর নাম উল্লেখ করেছেন। চিরকুটে লেখা ছিল, ‘হানি আর সুদীপ স্যার ভালো থাকো’। এই একটি বাক্যই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পুলিশি তল্লাশিতে মিমোর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে উক্ত শিক্ষকের সঙ্গে গভীর রাতে দীর্ঘ কথোপকথনের একাধিক প্রমাণও মেলে।
বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী নাসীরুল আমিন সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, মিমোর বাবা বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার প্রাথমিক তথ্য ও পরিবারের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মিমোর পরিবার দাবি করেছে, শিক্ষকের সাথে তাঁদের মেয়ের অস্বাভাবিক মানসিক টানাপোড়েন চলছিল, যার প্রতিফলন পাওয়া গেছে মোবাইল ফোনের খুদে বার্তা ও কল রেকর্ডে।
বিভাগীয় চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করে জানান, মিমো একজন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী ছিলেন। পরিবারের সাথে বাড্ডার বাসায় থাকা অবস্থায় এই ঘটনাটি ঘটে। চিরকুটে শিক্ষকের নাম থাকার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তাঁরাও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ঘটনায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মিমোর মৃত্যুতে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং উদ্ধারকৃত ডিজিটাল আলামতগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের ভূমিকা সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
একজন উচ্চশিক্ষিত ও মেধাবী শিক্ষার্থীর এভাবে ঝরে পড়া জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছাত্রীর মধ্যে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক কাঠামোর ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হওয়া উচিত শ্রদ্ধা ও আস্থার, কিন্তু সেখানে যদি মানসিক নিপীড়ন বা প্ররোচনার মতো বিষয় যুক্ত হয়, তবে তা সমাজের অবক্ষয়েরই প্রমাণ। আইন যেন নিরপেক্ষভাবে কাজ করে এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে মিমোর পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।