ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের বিতর্কিত সাবেক সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভার হত্যাচেষ্টা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। মঙ্গলবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই আবেদন জমা দেওয়া হয়, যার ওপর আগামী ১০ মে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, সাধারণ শিক্ষার্থী নির্যাতন ও হল বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেত্রী তামান্না জেসমিন রিভার আইনি লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে। সোমবার হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলেও চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় সোমবার বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিভাকে জামিন প্রদান করেন। একই সঙ্গে তাকে কেন স্থায়ী জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। তবে রাষ্ট্রপক্ষ এই আদেশের বিরোধিতা করে আজ মঙ্গলবার জামিন স্থগিতের আবেদন জানায়। আপিল বিভাগ আবেদনটি গ্রহণ করে আগামী ১০ মে শুনানির দিন ধার্য করেছেন। ফলে আপাতত কারাগারেই থাকতে হচ্ছে এই ছাত্রলীগকে নেত্রীকে।
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ইডেন কলেজের ছাত্রীনিবাসে অবস্থান করা রিভা মার্কেটিং বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি কলেজের প্রশাসনিক ও আবাসিক পরিবেশ কলুষিত করেছেন। গত ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে রাজধানীর একটি গোপন আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার করে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন।
ইডেন কলেজে রিভার বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সিট বাণিজ্য, ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ ছাত্রীদের মিছিলে যেতে বাধ্য করার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে জুলাইয়ের গণআন্দোলনের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর তার নেতৃত্বে হামলা চালানো হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ভিডিও এবং অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।
আদালত সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপক্ষ মনে করছে রিভার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং জামিন পেলে তিনি মামলার সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাতে পারেন। এছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠনের নেত্রী হওয়ায় তার জামিন জননিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
ছাত্র রাজনীতি যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পরিবর্তে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, তখন তামান্না জেসমিন রিভার মতো চরিত্রের সৃষ্টি হয়। বছরের পর বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অছাত্রদের অবস্থান এবং প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা ইডেনের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করেছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই ধরনের অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার হওয়া জরুরি। রাষ্ট্রপক্ষ ও আদালতের এই আইনি প্রক্রিয়া কেবল একজন ব্যক্তির বিচার নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন কোনো ছাত্রসংগঠন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর জুলুম করার সাহস না পায়, তার জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকা উচিত।