রাজধানীর সড়কগুলোতে গত কয়েকদিনের জ্বালানি সংকট আজ বুধবার আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হচ্ছে না, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট।
আজ বুধবার সকাল থেকেই রাজধানীর সড়কগুলোতে দেখা গেছে এক অসহনীয় চিত্র। নগরীর বেশিরভাগ জ্বালানি বিক্রয় কেন্দ্রে (পেট্রোল পাম্প) ঝোলানো রয়েছে ‘তেল নেই’ লেখা বোর্ড। যেসব পাম্পে সীমিত আকারে তেল মিলছে, সেখানে মধ্যরাত থেকেই দাঁড়িয়ে আছে শত শত যানবাহন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থেকেও অনেক চালক শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি ছাড়াই ফিরে যাচ্ছেন।
তেলের জন্য অপেক্ষারত ভুক্তভোগী চালক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান রেশনিং পদ্ধতিতে (সীমিত বরাদ্দ অনুযায়ী বিতরণ) তেল পেতে একেকজনকে প্রায় ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও নিশ্চয়তা মিলছে না যে শেষ পর্যন্ত তেল পাওয়া যাবে কি না। চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় নষ্ট করে সিরিয়াল পাওয়ার পর পাম্প থেকে যে পরিমাণ জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। অনেক ক্ষেত্রে সারা দিনের ট্রিপ বা যাতায়াতের জন্য এই সামান্য তেল যথেষ্ট নয়।
এদিকে জ্বালানি তেলের এই লাইনের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সার্বিক যাতায়াত ব্যবস্থায়। অনেক জায়গায় দেখা গেছে, তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক, বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির সারি চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে প্রধান সড়কগুলোর এক পাশ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে রয়েছে। তেলের লাইনের এই গাড়ির জটের কারণে মূল সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। বিশেষ করে সকালে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।
পাম্প মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা জানিয়েছেন, প্রধান সরবরাহ কেন্দ্র (ডিপো) থেকেই চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। সরবরাহে এই বড় ধরণের ঘাটতি থাকায় যা-ও পাওয়া যাচ্ছে, তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে ‘জ্বালানি কার্ড’ বা ‘ফুয়েল কার্ড’ প্রবর্তন করে কিছুটা সুফল পাওয়া গেলেও রাজধানীতে এখনো এমন কোনো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
একটি সচল অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে, জ্বালানির এই তীব্র অভাব কেবল পরিবহন ব্যবস্থার সংকট নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার স্থায়িত্বকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষের যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তার আর্থিক ক্ষতি অপূরণীয়। প্রশাসনকে কেবল সরবরাহের দোহাই না দিয়ে সুশৃঙ্খল বিতরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সিরাজগঞ্জের মতো অভিনব কোনো পদ্ধতি কেন রাজধানীতে চালু করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবার সময় এসেছে।