দেশের কারা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হলো এক নতুন ও যুগান্তকারী অধ্যায়। আধুনিকায়ন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও অনিয়ম রোধের লক্ষ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে ‘ক্যাশলেস’ (নগদ অর্থবিহীন) ডিজিটাল কারা ব্যবস্থাপনা। প্রযুক্তির এই বৈপ্লবিক ব্যবহারের ফলে বন্দিদের আর্থিক লেনদেনে যেমন শতভাগ স্বচ্ছতা এসেছে, তেমনি তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও অবস্থান শনাক্তকরণেও যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।
রোববার (২১ জুন) সকালে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ এনায়েত উল্ল্যাহ যুগান্তকারী এই উদ্যোগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর এই পদ্ধতির মাধ্যমে কারাগারের ভেতরে বন্দিদের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ডিজিটাল করা হয়েছে, ফলে ভেতরে নগদ টাকার কোনো অস্তিত্ব আর থাকছে না।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অত্যন্ত সুরক্ষিত এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় ‘আরএফআইডি’ (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন) প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কারাগারের ভেতরে যেকোনো বন্দির অবস্থান খুব সহজেই এবং দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, বন্দিদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নির্ভুলভাবে তাদের গণনা করা যাবে, যা কারাগারের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
নতুন এই নিয়মে বন্দিদের আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও সুরক্ষিত করা হয়েছে। বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে আসা স্বজনেরা যখন তাদের খরচের জন্য কোনো অর্থ প্রদান করবেন, তখন দায়িত্বরত কারা কর্মকর্তা তা গ্রহণ করে সরাসরি ওই বন্দির নামে থাকা আরএফআইডি কার্ডের অ্যাকাউন্টে (ভার্চুয়াল হিসাবে) জমা করে দেবেন। সংগৃহীত মূল নগদ টাকা সরাসরি সরকারি ব্যাংকে জমা হয়ে যাবে। এরপর বন্দিরা তাদের ওই বিশেষ কার্ড ব্যবহার করে কারা ক্যান্টিন থেকে প্রয়োজনীয় খাবার বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারবেন। এর ফলে কারাগারের ভেতরে কারারক্ষী বা বন্দিদের মধ্যে নগদ টাকার কোনো ধরনের আদান-প্রদান হবে না।
এছাড়া, কোনো বন্দি যখন জামিনে বা সাজা শেষে মুক্তি পাবেন, তখন তার ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টে যদি কোনো উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে, তবে তা অনলাইন ব্যাংকিং অথবা মুঠোফোন ভিত্তিক আর্থিক সেবার (যেমন: বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের দ্বারা তাকে সরাসরি ফেরত দেওয়া হবে।
কারা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ঐতিহ্যগতভাবে দেশের কারাগারগুলোতে নগদ অর্থকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও অনিয়মের অভিযোগ শোনা যায়। নতুন এই প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি সেসব অভিযোগের মূলে কুঠারাঘাত করবে। একই সঙ্গে আর্থিক জবাবদিহি বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্দিদের নিজস্ব অর্থের শতভাগ নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেনের সরাসরি দিকনির্দেশনায় এই আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ডিকোড ল্যাব’ এবং কারা অধিদপ্তরের নিজস্ব ‘প্রিজন্স আইসিটি সেল’।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, “মানবিক ও আধুনিক কারা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারকে দেশের প্রথম ক্যাশলেস বা নগদ অর্থবিহীন কারাগার হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এটি কারাগারের ভেতরে সম্পূর্ণ নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করবে। সফলভাবে বাস্তবায়নের পর পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারগুলোতেও এই ডিজিটাল মডেল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।”