বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নিয়েছে বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, দেশে উগ্রবাদী তৎপরতা একেবারে নেই—এমন দাবি করা যেমন ভুল, তেমনি একে অতিরঞ্জিত করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলাও অনুচিত। সরকার বর্তমানে এই সমস্যাকে চিহ্নিত করে তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডা. জাহেদ উর রহমান এসব কথা বলেন। দেশের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং উগ্রবাদ দমনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
চরমপন্থা ও রাজনৈতিক বয়ান
উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের দুটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত সরকার জঙ্গিবাদের ইস্যুটিকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরত যাতে তারা বহির্বিশ্বে নিজেদের অপরিহার্য প্রমাণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। এটি ছিল তাদের একটি রাজনৈতিক কৌশল বা বয়ান। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনেকে দাবি করার চেষ্টা করেছেন যে দেশে কোনো জঙ্গি নেই। ডা. জাহেদ উর রহমান স্পষ্ট করে বলেন, "এই দুটি ধারণাই চরমপন্থী এবং ভুল। বাংলাদেশে উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদ একসময় ছিল এবং এখনো তার অস্তিত্ব আছে। আমরা এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করছি না বরং তা মোকাবিলা করতে চাই।"
উগ্রবাদীদের সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা
গত দেড় বছরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে উগ্রবাদী আদর্শের অনুসারীরা নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছে বলে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে কিছু মানুষ প্রকাশ্যে আসার প্রবণতা দেখিয়েছে, যা কিছুটা ঝুঁকি তৈরি করেছে। তবে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, এই ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এই 'ব্যাধি' নির্মূল করতে চায়। কোনো সমস্যাকে স্বীকার না করলে তার সমাধান সম্ভব নয় বলেই সরকার এই সত্যটি প্রকাশ্যে এনেছে।
কারামুক্ত অভিযুক্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এবং পরবর্তী সময়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়া অভিযুক্তদের প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান, সরকার তাদের নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছে। তবে তিনি 'জঙ্গি' শব্দটির যথেচ্ছ ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, "আদালত কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত আমরা তাদের অভিযুক্ত বলব। শেখ হাসিনার আমলে নিরপরাধ মানুষকেও জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে হয়রানি বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার করার ঘটনা ঘটেছে। আমরা সেই পথে হাঁটব না।"
জামিনে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি জানান, যদি কেউ পুনরায় উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার প্রমাণ দেয়, তবে সরকার কঠোরভাবে তাদের জামিন বাতিলের আবেদন জানাবে। আদালত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, তবে সরকারের অবস্থান হবে অত্যন্ত কঠোর।
গণতান্ত্রিক পথ বনাম বিশেষ মতাদর্শ
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বিশেষ ধর্মীয় আইন বা শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ যেহেতু একটি উদার গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তাই ওই গোষ্ঠীটি অসন্তুষ্ট হতে পারে। এদের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি। তবে রাষ্ট্র যে কোনো মূল্যে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া একটি ইতিবাচক ও সাহসী পদক্ষেপ। অতীতে এই ইস্যুটিকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে অথবা পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে, যার ফলে উগ্রবাদ আড়ালে বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। বর্তমান সরকারের এই স্বচ্ছ অবস্থান এবং 'জঙ্গি' ট্যাগ দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সতর্কতা নির্দেশ করে যে, তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায়। তবে কারামুক্ত অভিযুক্তদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা এবং উগ্রবাদী মতাদর্শের মূলে আঘাত হানা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।