দেশের প্রথম নারী স্পিকার এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেত্রী ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মঙ্গলবার শেষ রাতে রাজধানীর ধানমন্ডির নিজ বাসভবন থেকে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়, যা নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
সাতসকালে রাজধানীজুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে। মঙ্গলবার ভোররাত আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে ধানমন্ডির ৮/এ সড়কের নিজ বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দায়িত্বশীল সূত্র এই আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
যদিও ডিবির পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এই আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে তার বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন বেশ বর্ণাঢ্য। ২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেন। টানা এক দশকেরও বেশি সময় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ অলংকৃত করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় আইনসভার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি একজন প্রথিতযশা আইনজীবী এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইচডি—গবেষণাভিত্তিক উচ্চতর ডিগ্রি) অর্জন করেছেন। স্পিকার থাকাকালীন তিনি নারী নেতৃত্ব বিকাশ, শিশু অধিকার রক্ষা এবং সংসদীয় কার্যক্রমকে আধুনিকায়ন করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সংসদীয় জোট) নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিলেন।
তবে বিগত কিছু সময় ধরে তিনি নানা বিতর্কের মুখে পড়েন। গত বছর রংপুরে এক স্বর্ণকারের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় আওয়ামী লীগের আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রীকে আসামি করা হয়েছিল। মামলার পর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয় এবং জানা যায় যে, তার পাসপোর্ট সংক্রান্ত প্রক্রিয়াও স্থগিত করা হয়েছিল। সেই মামলার সূত্র ধরেই বা নতুন কোনো অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে আটক করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।
একজন সাবেক স্পিকার তথা রাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তির আটক হওয়া দেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর মতো একজন আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রতিটি পদক্ষেপে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন, যাতে জনমনে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা অটুট থাকে।