সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক যুগ পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পোশাক শিল্পের দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তবে এই অভাবনীয় অগ্রগতির পেছনে যেমন হাজারো শ্রমিকের আত্মত্যাগ রয়েছে, তেমনি দীর্ঘ ১৩ বছর পরেও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও বিচার পাওয়া নিয়ে রয়ে গেছে বিস্তর অভিযোগ ও দীর্ঘশ্বাস।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার সেই ভয়াবহ দৃশ্য আজও বিশ্ববাসীকে শিহরিত করে। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই শিল্প দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের অকাল মৃত্যু কেবল শোকেরই জন্ম দেয়নি, বরং নাড়িয়ে দিয়েছিল আমাদের অর্থনীতির ভিত্তিকেও। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই গত এক যুগে দেশের তৈরি পোশাক খাত আমূল বদলে গেছে। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বুকে এক অনন্য উদাহরণ।
নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জোটগুলোর (অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স) কঠোর তদারকিতে গড়ে উঠেছে আধুনিক সব কারখানা। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে মানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব কারখানাগুলোর বড় একটি অংশই বাংলাদেশে অবস্থিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ ভবন পরিষদের (ইউএসজিবিসি) তথ্যমতে, এ পর্যন্ত দেশের ২৮০টি কারখানা পরিবেশবান্ধব ‘লিড’ (পরিবেশ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী নকশায় শ্রেষ্ঠত্ব) সনদ পেয়েছে। এর মধ্যে ১১৮টি কারখানা সর্বোচ্চ মানদণ্ডের ‘প্লাটিনাম’ এবং ১৪৩টি কারখানা ‘গোল্ড’ মর্যাদা পেয়েছে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গর্বের সঙ্গে জানান, রানা প্লাজা পরবর্তী সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স (কারখানার অভ্যন্তরীণ বিধিবদ্ধ নিয়মাবলি) পালনে আমরা এখন বৈশ্বিক মানে সবার ওপরে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, পশ্চিমা ক্রেতারা শ্রমিক অধিকার নিয়ে যতটা সোচ্চার, পোশাকের ন্যায্য মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীন। পণ্যের সঠিক দাম না পাওয়ায় শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা প্রায়শই কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে শ্রমিক নেতাদের কণ্ঠে ঝরছে হতাশা। বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার আক্ষেপ করে বলেন, ১৩ বছর কেটে গেলেও রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ বিচার শেষ হয়নি। মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাসহ অন্যদের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
শ্রম বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও রয়ে গেছে বিশাল ফাঁক। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদের মতে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বর্তমান কম মজুরি একটি বড় বাধা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আইনি সুরক্ষার অভাবে অনেক পরিবারই সঠিক সহায়তা পায়নি। তাই জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ক্ষতিপূরণ নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
রানা প্লাজার ক্ষত আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে দালানকে নিরাপদ করতে হয়, কিন্তু শ্রমিকের জীবনের মূল্য কি আমরা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পেরেছি? কারখানার দেয়াল আজ মজবুত হয়েছে, ছাদ হয়েছে সবুজ; কিন্তু সেই ছাদের নিচে কাজ করা মানুষগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়ার পথটি আজও কণ্টকাকীর্ণ। নিরাপদ কর্মপরিবেশের পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন না ঘটলে এই অগ্রযাত্রা পূর্ণতা পাবে না।