নাটোরের লালপুরে পারিবারিক কলহের জেরে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। স্ত্রীকে ভিডিও কলে রেখে নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন আল আমিন বিশ্বাস নামের এক গ্রাম পুলিশ সদস্য।
নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার উত্তর লালপুর গ্রামে মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে এই করুণ মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে। নিহত আল আমিন বিশ্বাস ওই গ্রামেরই স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম পুলিশ (তৃণমূল পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী) হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে পেশাগত জীবনে শৃঙ্খলা থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন বলে জানা গেছে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, আল আমিনের সঙ্গে তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র মনোমালিন্য চলছিল। পারিবারিক এই বিবাদ চরম আকার ধারণ করলে দিনকয়েক আগে জান্নাতুল স্বামীর ওপর অভিমান করে তার বাবার বাড়িতে চলে যান। স্ত্রীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন আল আমিন, যা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলে।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক বারোটার দিকে আল আমিন তার স্ত্রীর মুঠোফোনে দৃশ্যমান আলাপন (ভিডিও কল) করেন। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে তিনি চরম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে স্ত্রীকে ফোনের পর্দায় রেখেই ঘরের ভেতর জান্নাতুলের ফেলে যাওয়া একটি ওড়না দিয়ে সিলিংয়ের সঙ্গে ফাঁস দেন আল আমিন। স্ত্রীকে ভিডিও কলে থাকা অবস্থাতেই এমন ভয়ানক দৃশ্য দেখতে হয়, যা মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরপরই পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং দ্রুত স্থানীয় থানায় খবর দেন। সংবাদ পেয়ে লালপুর থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সদস্যরা ঘরের দরজা ভেঙে আল আমিনের ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করেন। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পারিবারিক কলহজনিত আত্মহত্যা বলে মনে করা হচ্ছে। স্ত্রীকে ভিডিও কলে রেখে এই আত্মহননের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও ভিডিও কলের কথোপকথনের বিস্তারিত তথ্য এবং প্রযুক্তিগত প্রমাণগুলো এখনো পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যখন একে অপরের অনেক কাছাকাছি থাকার কথা, তখন একাকিত্ব এবং পারিবারিক অশান্তি মানুষকে কতটুকু অন্ধকার পথে ঠেলে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। ক্ষণিকের রাগ বা অভিমান যে একটি সাজানো সংসারকে নিমিষেই তছনছ করে দিতে পারে, আল আমিনের এই পরিণতি সমাজকে সেই বার্তাই দিচ্ছে। আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর মানসিক স্বাস্থ্যের খবর রাখা এবং বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। রাগ বা জিদ কি একটি জীবনের চেয়েও বড় হতে পারে? উত্তরটি আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের বিবেকের কাছে খোঁজা উচিত।