নারায়ণগঞ্জের সেই নৃশংস সাত খুনের ঘটনার ১২ বছর অতিবাহিত হলেও চূড়ান্ত বিচার পাননি নিহতদের পরিবার। দীর্ঘ সাড়ে সাত বছর ধরে উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে মামলাটি ঝুলে থাকায় স্বজনদের মধ্যে চরম হতাশা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দেওয়া ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি এখন বর্তমান সরকারের কাছে তাঁদের শেষ ভরসা।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক থেকে সাতজনকে অপহরণের পর যে ভয়াবহ স্মৃতি শীতলক্ষ্যার বুকে ভেসে উঠেছিল, তার ক্ষত আজও শুকায়নি। সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাটি নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো রাষ্ট্রকে। ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ নিম্ন আদালত এবং পরবর্তীকালে উচ্চ আদালত খুনিদের সর্বোচ্চ সাজার আদেশ দিলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এসে থমকে গেছে বিচার প্রক্রিয়া।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলার কার্যক্রমকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রথম সাড়ে তিন বছরে মামলার দুটি ধাপ শেষ হলেও গত সাড়ে সাত বছর ধরে নথিপত্র স্রেফ পড়ে আছে। নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা সাধারণ মানুষ বলেই কি বিচারের পথ এত দীর্ঘ? অপরাধীরা ক্ষমতাবান আর বিত্তশালী হওয়ার কারণেই কি সুপ্রিম কোর্টে এসে বিচার ঢিলা হয়ে গেল?"
একই রকম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। তিনি জানান, প্রধান আসামি নূর হোসেনের জামিনে মুক্তির গুঞ্জন তাঁদের আতঙ্কিত করে তুলছে। তিনি বলেন, "আমরা তো সব হারিয়েছি, এখন শুধু আল্লাহর কাছে বিচার চাই। নিম্ন আদালতের রায়ের পর ভেবেছিলাম খুব দ্রুত বিচার পাব, কিন্তু আপিল বিভাগে কেন সব আটকে আছে তা আমাদের বোধগম্য নয়।"
একটি আবেগপূর্ণ স্মৃতিচারণ করে নিহতদের স্বজনরা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সশরীরে নিহতদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর মাথায় হাত রেখে তিনি ওয়াদা করেছিলেন যে, তাঁর দল ক্ষমতায় এলে এই নৃশংসতার বিচার সবার আগে করবেন। বর্তমানে তাঁর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে থাকায় স্বজনরা আশায় বুক বাঁধছেন। তাজুলের ভাই রাজু আহমেদ বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের উদ্দেশ্যে বলেন, "আপনি নিজেও ভাই হারানোর বেদনা বোঝেন। মায়ের দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে আমাদের বিচারটা নিশ্চিত করুন।"
আইনজীবীরা বলছেন, জনগণের প্রবল চাপের মুখে তৎকালীন সরকার নিম্ন ও উচ্চ আদালতে দ্রুত বিচারের নাটক সাজালেও মূলত আপিল বিভাগে ফাইল আটকে রেখে খুনিদের রক্ষার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ায় দ্রুত শুনানির মাধ্যমে এই কলঙ্কময় হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি সমাজকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মতো একটি স্পর্শকাতর মামলা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। যখন রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে সাধারণ মানুষকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেই বিচারের ভার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শুধু রায় ঘোষণা নয়, বরং দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমেই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস লাঘব করা সম্ভব।