নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক বৈশ্বিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও ইউএন উইমেন (জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা)। একই সঙ্গে সমাজে লিঙ্গসমতা নিশ্চিতকরণ এবং নারীর অধিকার সুরক্ষায় দ্বিপক্ষীয় ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল (উপ-মহাসচিব) এবং ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক সিমা বাহাউসের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় অর্জিত অভূতপূর্ব অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন ইউএন উইমেনের নির্বাহী পরিচালক সিমা বাহাউস। তিনি বিশ্বব্যাপী নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা (কর্মসূচি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিদ্যমান অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি নারী শান্তিরক্ষীদের অসামান্য সাহসিকতা, পেশাদারত্ব ও গৌরবময় অবদানের কথা তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন। পাশাপাশি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশ সম্প্রতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান সিমা বাহাউস।
অন্যদিকে, নারীর সামগ্রিক ক্ষমতায়ন ও অধিকার সুরক্ষার প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এবং অবিচল অঙ্গীকারের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা স্মরণ করেন, যার মাধ্যমে দেশে নারীদের জন্য প্রথম অবৈতনিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের অধীনেও নারীদের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মেয়েদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু এবং প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণের মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপগুলোর কথা তিনি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। এ সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে ইউএন উইমেনের আরও নিবিড় ও ফলপ্রসূ সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকের শেষাংশে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয় চলমান রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নারী ও কন্যাশিশুদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের জন্য পরিচালিত মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক বিশ্ব সম্প্রদায়ের অর্থায়নের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ভার দীর্ঘদিন বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই রোহিঙ্গা সংকটের একটি দ্রুত ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর তিনি জোর দেন। বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দ্রুত, সসম্মানে ও নিরাপদে তাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের জন্য বৈশ্বিক চাপ অব্যাহত রাখার জোরালো আহ্বান জানান শামা ওবায়েদ ইসলাম।
জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন। তাই এই বৈঠকে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতে নারীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের এই যৌথ প্রয়াস আগামী দিনে দেশের নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে।