বাংলাদেশের চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিভে গেল। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট শিল্প নির্দেশক এবং খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী তরুণ ঘোষ বুধবার দিবাগত রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বরেণ্য এই শিল্পীর প্রয়াণের সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা এন রাশেদ চৌধুরী। জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি হাঁপানি (শ্বাসকষ্টজনিত রোগ) থেকে সৃষ্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৩ বছর। তাঁর প্রয়াণ কেবল একজন ব্যক্তির চলে যাওয়া নয়, বরং একটি সৃজনশীল অধ্যায়ের অবসান।
১৯৫৩ সালের ২০ আগস্ট রাজবাড়ী জেলায় জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটি সারাজীবন শিল্পের আরাধনা করে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভারতের বরোদায় পাড়ি জমান। তাঁর মেধা ও মনন ছিল বহুমাত্রিক। কর্মজীবনের শুরুতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে বিভাগটি গড়ে তোলায় অনন্য ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে দায়িত্ব পালন করে ২০১২ সালে কিপার (জাদুঘরের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা) পদ থেকে অবসর নেন।
চিত্রকলার পাশাপাশি রূপালি পর্দার পেছনের কারিগর হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। চলচ্চিত্রের পরতে পরতে দৃশ্যপটকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল দেখার মতো। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের চলচ্চিত্র 'কিত্তনখোলা'-তে অসাধারণ শিল্প নির্দেশনার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও তারেক মাসুদের বিশ্বজয়ী চলচ্চিত্র 'মাটির ময়না', 'নরসুন্দর' এবং এন রাশেদ চৌধুরীর 'চন্দ্রাবতী কথা'-র মতো গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রে তাঁর সৃজনশীল ছোঁয়া রয়েছে। এমনকি তাঁর মৃত্যুর আগেও তিনি 'সখী রঙ্গমালা' চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনার কাজ শেষ করে গেছেন।
তরুণ ঘোষের চিত্রকর্মে বারবার উঠে এসেছে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, পুরাণ (প্রাচীন কাহিনী) ও শেকড়ের ইতিহাস। তাঁর আঁকা 'বেহুলা' চিত্রমালা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এশীয় চারুকলা পুরস্কার জয় করে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রকৃতি ও মানুষের যাপিত জীবনের নানা অনুভূতি তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। তাঁর শিল্পকর্মগুলোতে আধুনিকতার পাশাপাশি মাটির টান স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠত।
তরুণ ঘোষের মতো শিল্পীদের প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি তাঁর তুলির আঁচড় এবং চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনার মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের উচিত তাঁর কাজের ধারা ও লোকজ ঐতিহ্যের আধুনিক ব্যবহারের কৌশল থেকে শিক্ষা নেওয়া। শিল্পীর মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টি চিরকাল দর্শকদের মনে বেঁচে থাকবে।