আকাশে মেঘের ঘনঘটা এখন আর কেবল বৃষ্টির পূর্বাভাস নয়, বরং এক অজানা আতঙ্কের নাম। বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন এক ভয়াবহ ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা প্রতি বছর কেড়ে নিচ্ছে শত শত সাধারণ মানুষের প্রাণ। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হলেও তার সুফল এখনো মাঠ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ এই দুর্যোগে প্রাণ হারাচ্ছেন, যাদের বড় একটি অংশই প্রান্তিক কৃষক। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অর্ধশতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ গত রোববার একদিনেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাণহানির ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং পরিবেশ দূষণের ফলে বজ্রপাতের তীব্রতা ও সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও এটি প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগগুলো বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। অতীতে তালগাছ রোপণের মতো বড় কর্মসূচি নেওয়া হলেও দুর্নীতি ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা বাতিল করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন জেলায় বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটেনিং অ্যারেস্টার) স্থাপনের প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই দণ্ডগুলো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না বসিয়ে নিরাপদ জায়গায় বসানো হয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলোর বেশিরভাগই অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে একটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল আকর্ষণ হলো ‘মাল্টিপারপাস শেড’ (বহুমুখী আশ্রয়স্থল) নির্মাণ। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল ও খোলা মাঠের কৃষকরা যেন মেঘ দেখামাত্রই নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন, সেজন্য এক বিঘা জমির ওপর এই কনক্রিটের শেডগুলো তৈরি করা হবে। এগুলো শুধু বজ্রপাত থেকেই সুরক্ষা দেবে না, বরং বন্যা বা অন্যান্য দুর্যোগের সময়ও সাধারণ মানুষের কাজে আসবে। প্রাথমিকভাবে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জসহ সাতটি জেলা থেকে এই প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবনা চাওয়া হয়েছে।
তবে সরকারি কর্মকর্তারা বারবার একটি বিষয়ে জোর দিচ্ছেন—তা হলো ‘সচেতনতা’। দেখা গেছে, বজ্রপাতে নিহতদের ৭০ শতাংশই মাঠে কাজ করার সময় আক্রান্ত হন। খোলা আকাশের নিচে থাকা, গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বা বৃষ্টির সময় ধাতব বস্তু সঙ্গে রাখা মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের মতে, শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও বজ্রপাত নিয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। সংগঠনটি পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং অন্তত ৩০ মিনিট আগে পূর্বাভাসের তথ্য কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর দাবি জানিয়েছে।
বর্তমানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে স্কুল-কলেজ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারের নির্দেশ দিয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এসব নির্দেশনার বাস্তবায়ন এখনো আশানুরূপ নয়। নতুন প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও মাঠের মানুষ কত দ্রুত এর সুফল পাবেন, তা নিয়ে রয়ে গেছে সংশয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থামানো মানুষের সাধ্যের অতীত হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার প্রাণহানি অনেক কমিয়ে আনতে পারে। বজ্রপাত নিরোধক প্রকল্পগুলো কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বা দুর্নীতির কবলে পড়ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কৃষকরা আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, অথচ খোলা মাঠে তাদের জীবনের নিরাপত্তা আজও অনিশ্চিত। কেবল নতুন প্রকল্পের স্বপ্ন না দেখিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে এই মৃত্যুমিছিল থামানোর একমাত্র পথ।