জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আবারো উত্তাপ ছড়িয়েছে বিরোধী মত দমনের অভিযোগ। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এক আবেগঘন ও তীক্ষ্ণ বক্তব্যে দাবি করেছেন, দেশে আবারো একটি ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। তিনি কেবল ‘সহমত’ নয়, বরং সংসদের ভেতরে ও বাইরে নির্ভয়ে ‘দ্বিমত’ প্রকাশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানান।
রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এই সংসদ সদস্য বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, হাজারো মানুষের রক্ত ও দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এই সংসদ গঠিত হলেও এটি আবারো সেই ‘দুষ্টচক্রের’ (ভিসিয়াস সাইকেল) দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিরোধী মত দমনের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসছে এবং রাজনৈতিক কারণে হয়রানিমূলক মামলার প্রবণতা বাড়ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমরা এই সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গঠনমূলক সমালোচনা করতে চাই। আমরা নির্ভয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের মতামত জানাতে চাই।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার দলীয় নেতাদের সমালোচনা করায় বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসার মতো অন্তত নয়টি ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে ব্যঙ্গাত্মক চিত্র বা কার্টুনকে উৎসাহিত করছেন, সেখানে মাঠ পর্যায়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের তুলে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের সময়ে কেবল ‘সহমত’ প্রকাশের স্বাধীনতা ছিল, কিন্তু নতুন বাংলাদেশে মানুষ প্রকৃত বাকস্বাধীনতা ও দ্বিমত প্রকাশের অধিকার প্রত্যাশা করে।
ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিরতা এবং ‘গণরুম’ ও ‘গেস্টরুম’ সংস্কৃতির (ছাত্রাবাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ভাইদের নির্যাতনমূলক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা) প্রত্যাবর্তন নিয়ে তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সরকারি দলের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে মধ্যবিত্তের সন্তানদের ব্যবহার করে তাদের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার নষ্ট করা হচ্ছে, অথচ ক্ষমতাসীনদের সন্তানরা বিদেশে নিরাপদে পড়াশোনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা কেন্দ্রের বদলে কেবল রাজনৈতিক নেতা তৈরির কারখানায় পরিণত হচ্ছে বলেও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করে রাখা এবং পুলিশ সংস্কার কমিশনের অধ্যাদেশ (রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা বিশেষ আইন) বাতিল করার সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকত তবে আইনটি গ্রহণ করে পরবর্তীতে সংশোধন করা যেত। বিভাজনের রাজনীতি আবারো ফিরে আসলে জুলাই বিপ্লবে পরাজিত শক্তিরাই লাভবান হবে বলে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দেন।
একই অধিবেশনে চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার সরকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। দীর্ঘদিনের নির্যাতনের কারণে বিরোধী দল হয়তো কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না, তবে সরকার ও বিরোধী দল উভয় পক্ষেই নির্যাতিত মানুষ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
Closing Analysis: সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এই বক্তব্য আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক সংকটের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে। একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে কেবল শাসকদলের স্তুতি নয়, বরং ভিন্নমত ও সমালোচনার জায়গা থাকা অপরিহার্য। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তরুণ প্রজন্ম দেখেছিল, সেখানে যদি আবারো ভীতি ও মামলার সংস্কৃতি ফিরে আসে, তবে সেই লড়াইয়ের মূল স্পিরিট বা চেতনা ম্লান হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সংসদ কি পারবে এই আস্থার সংকট দূর করে প্রকৃত বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে?