জীবিকার তাগিদে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ে কয়লা তুলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন মজিবুর রহমান (৩৫) নামে এক বাংলাদেশি যুবক। গত বৃহস্পতিবার মেঘালয়ের একটি গভীর কয়লা খনিতে ধস নামলে পাথরের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় ফের শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মেঘালয় পাহাড়ের বিপজ্জনক কয়লা খনি বা 'মৃত্যুকূপ' থেকে কয়লা তুলতে গিয়ে অকালে প্রাণ দিতে হলো মজিবুর রহমানকে। নিহত মজিবুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের আলতু মিয়ার ছেলে। জানা গেছে, গত রোববার স্থানীয় একটি অসাধু চক্রের সহায়তায় তিনি বালিয়াঘাট সীমান্তের ৯৬/৭-এস পিলার এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নকলাম এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন।
ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার সকালে মজিবুরসহ একদল শ্রমিক ভূগর্ভস্থ কয়লা কুঠুরি বা কোয়ারি (মাটির গভীর থেকে খনিজ উত্তোলনের গর্ত) থেকে কয়লা সংগ্রহের কাজ করছিলেন। হঠাৎ খনির উপরের অংশ থেকে বিশাল এক পাথরের চাঁই ও কয়লার স্তূপ ধসে পড়ে। এ সময় সাথে থাকা অন্য শ্রমিকরা ক্ষিপ্রতার সাথে বের হতে পারলেও মজিবুর গর্তের ভেতরে আটকা পড়েন। তার মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত লাগলে ঘটনাস্থলেই তিনি নিথর হয়ে যান। পরে সহকর্মীরা অনেক প্রচেষ্টার পর তার মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্বজনরা মজিবুরের মরদেহ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন এবং তাহিরপুর উপজেলার লালঘাট গ্রামে তার শ্বশুরবাড়িতে রাখেন। খবর পেয়ে রাত আটটার দিকে তাহিরপুর থানা পুলিশ সেখানে পৌঁছে মরদেহটি উদ্ধার করে। আজ শুক্রবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বালিয়াঘাট সীমান্তের লাকমা গ্রামের জনৈক হোসেনসহ একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর 'উৎস' (গোপন তথ্যদাতা) পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই চক্রটি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়মিত দরিদ্র শ্রমিকদের মেঘালয়ের গভীর অরণ্যে কয়লা উত্তোলনের জন্য পাঠায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব গহীন গর্তে কাজ করতে গিয়ে এর আগেও বহু শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অনেকের খোঁজও মেলেনি।
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে মরদেহটি ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে সুনামগঞ্জ ২৮ সীমান্তরক্ষী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল একেএম জাকারিয়া কাদির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার নেপথ্যে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাওরবেষ্টিত দুর্গম এলাকার হতদরিদ্র মানুষের কাছে কয়লা উত্তোলনের কাজ অনেকটা ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে পরিচিত হলেও পেটের দায়ে তারা বারবার এই পথে পা বাড়াচ্ছেন। দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশের মাটিতে পরিচয়হীনভাবে মৃত্যুর এই মিছিল কবে থামবে? সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে এই করুণ মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। কেবল প্রশাসনিক কঠোরতা নয়, বরং সামাজিক সচেতনতাই পারে সাধারণ শ্রমিকদের এমন আত্মঘাতী পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে।