১৯৭৫ সালে মাত্র সাত মিনিটের সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে একদলীয় শাসন তথা বাকশাল গঠন করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক বিলের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের এই প্রেক্ষাপট টেনে আনেন।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল, ২০২৬’-এর ওপর আলোচনাকালে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, পঁচাত্তরের সেই একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। তার মতে, পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ ঘটে এবং বর্তমান সংসদ সেই গণতান্ত্রিক ধারারই একটি অংশ।
মুক্তিযুদ্ধ ও তৎকালীন সময়ের ভূমিকা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, একাত্তর সালে কার কী ভূমিকা ছিল, তা সৃষ্টিকর্তাই সবচেয়ে ভালো জানেন। আমরা সবাই সেই ইতিহাসের আংশিক সাক্ষী মাত্র। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ১৯৭৯ সাল থেকে জামায়াতে ইসলামী দেশপ্রেম ও মমত্ববোধ নিয়ে সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে।
আলোচনাধীন ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল’ প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই বিলটি পাসের বিষয়টি তারা সংসদের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছেন। দেশের প্রকৃত বীর সন্তানদের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত বিবেচনাবোধের মাধ্যমেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
সংসদের এই অধিবেশনে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মধ্যেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিতকরণ (বাতিল) ও পুনঃপ্রচলন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন এবং বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আইন রহিতকরণ বিল উল্লেখযোগ্য। এদিন সব মিলিয়ে আরও ৮টি পৃথক বিল সংসদীয় ভোটে পাস হয়। বিরোধী দলীয় সদস্যরা এই বিলগুলোর কিছু ধারা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও সরকারি দলের সংখ্যাধিক্যের কারণে সেগুলো আইন হিসেবে গৃহীত হয়।
এদিনের অধিবেশনে সংসদীয় বিতর্কে উত্তাপ থাকলেও ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ার পথে সবাইকে সহনশীল হতে হবে।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অমীমাংসিত বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। পঁচাত্তরের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা এবং পরবর্তী বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তন—এই দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হলে অতীতের ভুল-ত্রুটিগুলো নিয়ে সংসদে এ ধরনের খোলামেলা ও গঠনমূলক আলোচনার চর্চা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন।