দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হওয়া ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের সাবেক দল বিএনপিকে অভিনব ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, দলীয় শৃঙ্খলের বাইরে এসে নির্বাচন করার ফলেই তিনি দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার গভীরতা মাপতে পেরেছেন।
মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দশম দিনে এক আবেগঘন ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্য রাখেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি তার নির্বাচনি অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে সপাটে কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রুমিন ফারহানা তার নির্বাচনি লড়াইয়ের কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর এক অনিশ্চিত পথচলা শুরু হয়েছিল, কিন্তু সাধারণ মানুষ ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সেই পথকে সহজ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে যারা দলীয় বহিষ্কারের হুমকি ও নানা ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ছায়ার মতো তার পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি এক চমকপ্রদ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, "আমি আজ এই সংসদে দাঁড়িয়ে বিএনপিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আমাকে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য। দলীয় গণ্ডির ভেতর থেকে নির্বাচন করলে মানুষের যে বিশাল ভালোবাসা ও দোয়ার ভাণ্ডার আমি পেয়েছি, তা হয়তো কোনোদিন অনুধাবন করা সম্ভব হতো না। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত অগণিত মানুষের এই সমর্থনই প্রমাণ করে যে, আমি সঠিক পথেই ছিলাম।"
সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে রুমিন ফারহানা কড়া সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সংবিধানের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া প্রায় প্রতিটি কাজেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে হয়। ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা দূর করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি তার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং ‘৩১ দফা’ রূপরেখায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, এবারও রাষ্ট্রপতিকে মন্ত্রিসভার অনুমোদিত গদবাঁধা ভাষণই পাঠ করতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতির যদি নিজের মতো কথা বলার সামান্যতম স্বাধীনতা না থাকে, তবে ক্ষমতার ভারসাম্যের বুলি আউড়ানো অর্থহীন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে স্মরণ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। তিনি বলেন, "দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাকে পরম স্নেহে এই রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে এসেছিলেন। আজ সংসদে তার অনুপস্থিতি যে বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, তা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়।"
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং এটি দেশের প্রচলিত দলীয় রাজনীতির কাঠামোর প্রতি এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ। দলীয় প্রতীকের বাইরে গিয়ে একজন জনপ্রতিনিধি যখন বিপুল জনসমর্থন পান, তখন তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিসর নিয়ে তিনি যে সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলেছেন, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।