দেশজুড়ে তীব্র দাবদাহের মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট (লোডশেডিং)। রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও জেলা ও গ্রামগঞ্জের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। তীব্র গরমে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা, বন্ধ থাকছে সেচ পাম্প, বিঘ্নিত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। অতিষ্ঠ হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, ভাঙচুর ও মহাসড়ক অবরোধের মতো ঘটনা ঘটছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে জাতীয় সঞ্চালন লাইন (গ্রিড) ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট (বিদ্যুৎ পরিমাপের একক)। কিন্তু জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও ডলার সংকটের কারণে বাস্তবে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতেই হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ফলে চাহিদার তুলনায় বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা রূপ নিচ্ছে তীব্র লোডশেডিংয়ে।
সম্প্রতি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয়রা বিদ্যুৎ অফিস ভাঙচুর ও এক কর্মীকে মারধর করেন। এছাড়া সাতক্ষীরা, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও এবং মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (ফেসবুক) সাতক্ষীরার এক অভিভাবক আক্ষেপ করে লিখেছেন, সামনে সন্তানের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা, অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। প্রচণ্ড গরমে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করছে। তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে।
জাতীয় সংসদে এ নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী জানান, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তাল আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। তবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বন্ধ থাকা দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের (কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, “জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। এখন কেন্দ্রগুলো অলস বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ সক্ষমতা মাশুল (ক্যাপাসিটি চার্জ) দিতে হচ্ছে। এর ফলে কর ও মূসক (ট্যাক্স ও ভ্যাট) বাড়ছে, ভর্তুকি বাড়ছে, কিন্তু জনগণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।” তিনি পরিস্থিতির টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে গণশুনানির মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান।
বর্তমানে দেশে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বেসরকারি খাতের। কিন্তু প্রাথমিক জ্বালানি যেমন গ্যাস ও কয়লার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় এই বিপুল সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে হলে সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।