একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় ২৫শে মার্চ, যখন ঘুমন্ত বাঙালির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সেই রক্তঝরা কালরাত্রির দুঃসহ স্মৃতি আর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রাচ্যনাটের বিশেষ আয়োজন ‘লালযাত্রা’।
মূল প্রতিবেদন: বাংলার আকাশে সেদিন যে কালরাত্রি নেমে এসেছিল, তার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে এ দেশের মাটি ও মানুষ। সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে এবং গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে প্রতিবছরের মতো এবারও রাজপথে নেমেছেন শিল্পী, সংস্কৃতিসেবী ও সাধারণ মানুষ। আজ বিকেল সাড়ে চারটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংলগ্ন ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ চত্বর থেকে এই লালযাত্রা শুরু হয়। লাল পোশাকে সজ্জিত শত শত মানুষের এই মৌন মিছিলটি ফুলার রোডের ‘স্মৃতি চিরন্তন’ চত্বরে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
২০১১ সাল থেকে নিয়মিতভাবে এই ব্যতিক্রমী প্রতিবাদী শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে নাট্যদল প্রাচ্যনাট। আয়োজকদের মতে, লাল রঙের এই পরিভ্রমণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি শহীদদের পবিত্র রক্ত আর ত্যাগের এক জীবন্ত প্রতীক। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা হাতে হাত রেখে একাত্মতা প্রকাশ করেন সেই সব বীরদের প্রতি, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।
তবে এবারের লালযাত্রার ব্যাপ্তি কেবল একাত্তরের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আয়োজকরা জানান, ১৯শে মার্চ থেকে জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া সকলের প্রতিও এই যাত্রা উৎসর্গ করা হয়েছে। এটি এখন আর কেবল একটি দেশের সীমানায় আবদ্ধ নয়; বরং ফিলিস্তিন, গাজা, লেবানন, ইউক্রেন ও সুদানে চলমান যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং বিপন্ন মানবতার পক্ষে এক বৈশ্বিক প্রতিবাদে পরিণত হয়েছে।
শোভাযাত্রার মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এবং গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রাজপথ একাত্তরেও রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, আর আজ সেই একই পথে লাল পোশাক পরে তরুণ-প্রবীণের এই পদযাত্রা প্রমাণ করে যে, বাঙালি তার ইতিহাস ভোলেনি। এই যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন একেকটি দাবি—গণহত্যার বিশ্বজনীন স্বীকৃতি এবং সব ধরনের যুদ্ধ ও নিপীড়নের অবসান।
প্রাচ্যনাটের সদস্যরা জানান, তারা বিশ্বাস করেন শিল্পের মাধ্যমে যে প্রতিবাদ গড়ে তোলা সম্ভব, তা মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কাটে। গানে, কবিতায় আর নীরব পদচারণায় তারা আজ বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে ঝরে পড়া নিষ্পাপ প্রাণগুলোর বিচার দাবি করছেন। একাত্তরের সেই ধূলিকণা মেখেই তারা আজও মুক্তির পথে হেঁটে চলেছেন, যা এক শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায়।
বিশ্লেষণ: ২৫শে মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রামের এক অগ্নিপরীক্ষা। প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার জন্য দেওয়া রক্ত বৃথা যেতে পারে না। যখন বিশ্বজুড়ে আজও যুদ্ধের দামামা বাজে এবং নিরপরাধ মানুষের রক্ত ঝরে, তখন এই ধরণের প্রতিবাদী আয়োজন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি যেমন আমাদের শেকড়ের কথা বলে, তেমনি বিশ্বমানবতার সংকটে আমাদের সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে। ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া মানেই নতুন কোনো বিপদের পথ প্রশস্ত করা; তাই এই লালযাত্রা হোক অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন দ্রোহের প্রতীক।