পাহাড়ে আবারও বেজে উঠেছে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দামামা। রাঙামাটি সদর উপজেলায় দুর্বৃত্তদের ব্রাশফায়ারে প্রাণ হারিয়েছেন ধর্মশিং চাকমা (৪১) নামে এক পাহাড়ি নেতা। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন তার দুই বোন।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সদর উপজেলায় এক ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার ভোরে যখন পাহাড়ের মানুষ সবেমাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে উপজেলার কতুকছড়ি ইউনিয়নের আবাসিক এলাকায় এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। নিহত ধর্মশিং চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) অঙ্গসংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৬টার দিকে ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল হঠাৎ কতুকছড়ির ওই আবাসিক এলাকাটি ঘেরাও করে ফেলে। ধর্মশিং চাকমা বিপদ বুঝতে পেরে জীবন বাঁচাতে ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘাতকরা তাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এই পৈশাচিক হামলার সময় ভাইকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন তার দুই বোন। এতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ভাগ্য শোভা চাকমা (৩১) ও কৃপাসোনা চাকমা (৪৫) নামের দুই নারী গুরুতরভাবে আহত হন। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) সৈকত আকবর খান জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ দুই নারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীরে গোলার বা বুলেটের গভীর ক্ষত থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে (রেফার্ড করা হয়েছে)।
কতুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কানন চাকমা এই হত্যাকাণ্ডের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে বাড়িতে চড়াও হয়ে ধর্মশিং চাকমাকে গুলি করে মেরেছে। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে তার দুই বোনও এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। পুরো এলাকায় এখন চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাঙামাটি কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দীন জানান, পাহাড়ে গোলাগুলি ও একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি বিশেষ দল দুর্ঘটনাস্থলে রওনা হয়েছে। এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় এবং পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কারা এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পাহাড়ে শান্তি চুক্তির এত বছর পরও বিচারহীনতা আর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই থামছে না। একের পর এক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড পার্বত্য জনপদকে অশান্ত করে তুলছে। ধর্মশিং চাকমার মতো একজন রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যু এবং সাধারণ দুই নারীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা সেখানে কতটা ভঙ্গুর। কেবল লাশের মিছিল ভারী না করে প্রশাসনের উচিত দ্রুততম সময়ে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করা।