দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। উৎসবের এই আনন্দকে যেন অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে রাজশাহীর মসলার বাজারের অস্থিরতা। বাজারে সরবরাহের কোনো ঘাটতি না থাকলেও জিরা, এলাচ ও লবঙ্গের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে।
কোরবানির ঈদ মানেই ঘরে ঘরে মাংসের নানা সুস্বাদু পদ রান্নার মহোৎসব। আর এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো বাহারি মসলা। কিন্তু উৎসবের এই চাহিদাকে পুঁজি করে রাজশাহীর বিভিন্ন বাজারে মসলার দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে মহানগরীর সাহেববাজার, নিউমার্কেট, লক্ষ্মীপুর, শালবাগান, বিনোদপুর এবং কাটাখালি এলাকার বেশ কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা মসলার দোকান ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও দাম শুনে অনেকেই আঁতকে উঠছেন। সবচেয়ে বেশি ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে এলাচের দামে।
বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাত্র এক থেকে দেড় মাসের ব্যবধানে প্রতি কেজি এলাচের দাম প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজারে গুণগত মানভেদে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ৬০০ থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
শুধু এলাচ নয়, উত্তাপ ছড়িয়েছে জিরার দামেও। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকায়। অথচ মাত্র এক মাস আগেও এই একই জিরার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে। একইভাবে লবঙ্গের দামও কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে এক কেজি লবঙ্গ কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। এগুলোর পাশাপাশি দারুচিনি, গোলমরিচ, শুকনা মরিচ, আদা এবং পেঁয়াজের দামেও গত কয়েক সপ্তাহের তুলনায় স্পষ্ট ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
রাজশাহীর সাহেববাজারে পরিবারের জন্য মসলা কিনতে আসা গৃহিণী ফরিদা পারভীন আক্ষেপ করে বলেন, "আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে পুরো মাসের বাজার অনায়াসে করা যেত, এখন সেই একই টাকায় কয়েকদিনের মসলা কেনাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের সামনে দেখছি বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই, দোকানভর্তি মালপত্র, তবুও বিক্রেতারা দাম বাড়িয়েই চলেছেন।" তিনি আরও যোগ করেন, "ঈদ বা রমজান মাস আসলেই আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়, আর এর মাশুল গুনতে হয় আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে।"
সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য মজুত থাকা সত্ত্বেও যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াতে না পারেন, সেদিকে বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষ করে ঈদের আগে বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, দাম বাড়ার পেছনের কারণ হিসেবে খুচরা বিক্রেতারা দিচ্ছেন ভিন্ন যুক্তি। তাদের মতে, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছরই বাজারে মসলার চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে মাংস রান্নার কাজে জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ ও গোলমরিচের ব্যবহার এই সময়ে সবচেয়ে বেশি হয়। অনেকেই আবার শহরের বাসা ছাড়াও গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের জন্য বেশি পরিমাণে মসলা কিনে পাঠান। সব মিলিয়ে ঈদের আগে বাজারে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়।
রাজশাহীর মেহেরচণ্ডি বাজারের খুচরা মসলা ব্যবসায়ী রকি ইসলাম বলেন, "আমরা তো সাধারণ খুচরা বিক্রেতা, পাইকারি বাজার থেকেই আমাদের বাড়তি দামে পণ্য কিনে আনতে হচ্ছে। বড় বড় আমদানিকারকরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও আমদানি ঋণপত্র (বিদেশ থেকে পণ্য আনার জন্য ব্যাংকের গ্যারান্টি বা এলসি) খোলার জটিলতার কারণে তাদের বেশি দামে পণ্য আনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। তাই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক। তবে ঈদের এই বাড়তি চাপ চলে গেলে হয়তো দাম কিছুটা কমে আসবে।"
প্রতি বছরই ঈদ বা কোনো বড় উৎসবের আগে আমাদের দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার এই অশুভ প্রবণতা যেন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, আমদানি জটিলতা বা পরিবহন খরচের অজুহাত দিলেও, সাধারণ মানুষের কাছে এটি সিন্ডিকেট (অসাধু চক্র) বা কৃত্রিম সংকটের ফল হিসেবেই প্রতীয়মান হয়। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়াটা বাজার ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এ অবস্থায় শুধু আশ্বাস নয়, বরং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মজুতদার ও অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা অতি জরুরি। অন্যথায়, উৎসবের আনন্দ সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এক দীর্ঘশ্বাস হয়েই থেকে যাবে।