সাভারের রানা প্লাজা ধসের সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে এ দেশের মানুষকে। সহস্রাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও শেষ হয়নি বিচারকাজ। মূলত দীর্ঘ সাক্ষ্যগ্রহণের জালে আটকে আছে বিচারিক প্রক্রিয়া, যা নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন আইনজীবী ও নিহতের স্বজনরা।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রানা প্লাজা ভবনটি ধসে পড়লে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিক। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই মানবিক বিপর্যয়ের পর রানা প্লাজা ধসকে কেন্দ্র করে মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এর মধ্যে মাত্র একটি ছোট মামলা (ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন সংক্রান্ত) নিষ্পত্তি হয়েছে। অবহেলাজনিত মৃত্যুসহ বাকি তিনটি প্রধান মামলা এখনও বিচারিক আদালতের প্রাথমিক গণ্ডি পার হতে পারেনি।
সবচেয়ে আলোচিত হত্যা মামলাটির দিকে তাকালে এর ধীরগতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৫৯৪ জন সাক্ষী রয়েছেন। অথচ দীর্ঘ এক যুগে মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করা সম্ভব হয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ঠিক করেছেন আদালত। বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতার ফলে ৪১ জন আসামির মধ্যে ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া বাকি প্রায় সবাই এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কেউ পলাতক রয়েছেন, আবার কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, গত সরকারের আমলে এই বিশাল ট্র্যাজেডির বিচার কাজকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা বিচারিক গতিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, বিগত সরকারের সময় বিচার দ্রুত শেষ করার মতো সদিচ্ছার অভাব ছিল স্পষ্ট। ঘটনাটিকে মানবিক দিক থেকে দেখার চেয়ে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রবণতা বেশি থাকায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তখন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মাসুদ খান খোকন বলেন, বাকি সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিলে এবং আইনি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সম্পন্ন হলে বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব। তবে বর্তমান বাস্তবতায় আইনজীবীরা মনে করছেন, যে গতিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে তাতে চলতি বছরের মধ্যে চূড়ান্ত রায় ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
দেশের তৈরি পোশাক খাতের ভোল বদলে দেওয়া এই দুর্ঘটনার বিচার ঝুলে থাকায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে। হাজারো পরিবারের কান্নার দাগ মুছে গেলেও আইনি লড়াইয়ে তারা এখনও কোনো স্বস্তির বার্তা পাননি।
একটি দেশের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করে সময়মতো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর। রানা প্লাজার মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত একটি বিষয়ে ১৩ বছরেও রায় না আসা কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং এটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতকে আরও গভীর করছে। বিচারের বাণী যেন নিভৃতে না কাঁদে, সে জন্য দ্রুততম সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে রায় ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।